All posts
BengaliShort StoryHorrorThrillerFolkloreDooars

দশমীর পরের ভোর

দশমীর রাতে ডুয়ার্সের পাহাড়ে একটা কাচের কটেজ, তিন বন্ধু, আর ভোর চারটে তিপ্পান্নয় দুটো বাঘ। একটা বনদপ্তরের খাতায় আছে। আরেকটা নেই।

Read in English

১. দশমীর বিকেল

পুজোর ছুটিতে কলকাতায় থাকলে মা খুব খুশি হত। কিন্তু আমরা গিয়েছিলাম ডুয়ার্স।

আমরা মানে তিনজন। আমি, ইশান আর রোহন। যাদবপুরে একসঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছি, এখন তিনজন তিনটে আলাদা অফিসে চাকরি করি, কিন্তু বছরে একবার একসঙ্গে কোথাও যাওয়াটা আমাদের নিয়ম। প্ল্যানটা ইশানের। ও সবসময় এমন জায়গা খুঁজে বার করে, যার ছবি ইনস্টাগ্রামে দিলে লোকে হিংসে করবে। রোহন চুপচাপ ছেলে, যেখানেই যাক, পিঠে একটা গিটার থাকবেই। আর আমি? আমি সেই লোক, যে সবার টিকিট কাটে আর সবার জন্য টেনশন করে।

মা রাগ করেছিল। "দশমীর দিন বাড়ি থাকবি না? বিজয়ার প্রণামটা কে করবে?" অষ্টমীর অঞ্জলির পর মা আমার হাতে একটা লাল সুতো বেঁধে দিয়েছিল। বলেছিল, "ঠাকুরের সুতো। খুলবি না।" আমি কথা দিয়েছিলাম, দশমীর রাতে ফোন করে প্রণাম করব।

নবমীর রাতে শিয়ালদা থেকে কাঞ্চনকন্যা ধরে আলিপুরদুয়ার। তারপর গাড়িতে প্রায় দু'ঘণ্টা। প্রথমে দু'পাশে চা-বাগান, সবুজ আর সমান, যেন কেউ কাঁচি দিয়ে ছেঁটে রেখেছে। তারপর জঙ্গল শুরু হল, আর রাস্তাটা আস্তে আস্তে উঠতে লাগল বক্সার পাহাড়ের দিকে। ড্রাইভার আঙুল তুলে দেখাল, ওই যে উঁচু নীল পাহাড়গুলো, ওগুলো ভুটান।

চা-বাগান পেরিয়ে পাহাড়ের দিকে রাস্তা

নীলগড় জাঙ্গল রিট্রিট একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামের ঠিক পাশে। নিচে রাস্তার ধারে রিসেপশন, একটা পুরোনো কাঠের দোতলা বাড়ি, সামনে বারান্দা। তার আশেপাশে কয়েকটা সাধারণ কটেজ। গ্রামটা আরও নিচে, একটা পাহাড়ি নদীর ওপারে। আর রিসেপশনের পিছন থেকে একটা নুড়িপাথরের রাস্তা এঁকেবেঁকে উঠে গেছে পাহাড়ের গা বেয়ে। প্রায় আধ কিলোমিটার। ওই রাস্তার মাথায়, পাহাড়ের প্রায় কাঁধের কাছে, একা দাঁড়িয়ে আছে আমাদের কটেজ।

রিসর্টের মালিক রুদ্র রায়চৌধুরী নিজে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমাদের রিসিভ করলেন। খাকি জ্যাকেট, রিমলেস চশমা, খুব তাড়াতাড়ি কথা বলেন, আর কথা বলার সময় হাত নাড়েন। কলকাতায় বড় হয়েছেন, বেঙ্গালুরুতে বড় চাকরি করতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর সব ছেড়ে ফিরে এসেছেন, ঠাকুর্দার পুরোনো শিকারের বাংলোটাকে রিসর্ট বানাবেন বলে। কথা শুনেই বোঝা যায়, এটা ওঁর স্বপ্ন।

"এটা দেখুন," বলে উনি ফোন বার করে একটা অ্যাপ খুললেন। একটা ম্যাপ, তাতে কয়েকটা রঙিন বিন্দু। "বনদপ্তরের সঙ্গে মিলে বানিয়েছি। এই এলাকায় যে ক'টা বাঘ আছে, সবার গলায় রেডিও কলার। কে কোথায় আছে, আমি এখানে বসে দেখতে পাই।" ইশান ঝুঁকে পড়ে স্ক্রিনটা দেখল, তারপর মুখ তুলে একগাল হাসল। "ভাই, এ তো পুরো অফিসের ড্যাশবোর্ড!"

নুড়ির রাস্তা যেখান থেকে ওপরে উঠতে শুরু করেছে, সেখানে একটা বিশাল পুরোনো শিমুল গাছ। গাছের গোড়ায় একটা কালো পাথর, তাতে সিঁদুর লেপা, চারপাশে শুকনো আর টাটকা গাঁদাফুল। গ্রামের দিকে এরকম থান অনেক দেখা যায়। পাথরের পাশে উবু হয়ে বসে ছিলেন এক বুড়ো মানুষ। রোগা, খালি গা, পরনে সাদা ধুতি, মাথার চুল ধবধবে সাদা।

শিমুলতলার থান

"বংশীকাকা," রুদ্রবাবু বললেন। "ঠাকুর্দার আমল থেকে আছেন। ওপরের কটেজটা আসলে ওঁরই সংসার। ঝাড়পোঁছ, দেখাশোনা, সব উনি করেন।"

বংশীকাকা উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন। কিছু বললেন না। শুধু আমাদের তিনজনের মুখের দিকে একবার করে তাকালেন।

আর তখনই কোথা থেকে দৌড়ে এল একটা ছেলে।

রোগা, লম্বা, বয়স বড়জোর ষোলো। গায়ে একটা পুরোনো ইন্ডিয়ার ক্রিকেট জার্সি, পিছনে লেখা কোহলি, আঠারো নম্বর। মুখে এত বড় একটা হাসি, যে দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। "দাদু, আমি নিয়ে যাচ্ছি!" বলে আমরা কিছু বলার আগেই আমাদের দুটো ভারী ব্যাগ দু'কাঁধে তুলে নিল।

"আমার নাতি, সানি," বংশীকাকা বললেন। আর এই প্রথম ওঁর মুখে একটু হাসি দেখলাম।

আধ কিলোমিটার চড়াই রাস্তা, আর সানি সারা রাস্তা একবারও চুপ করেনি। কলকাতা কেমন? মেট্রোতে সত্যি মাটির নিচ দিয়ে ট্রেন যায়? আমরা ইডেনে খেলা দেখেছি কি না? কোহলিকে সামনে থেকে দেখেছি কি না? আমরা ইঞ্জিনিয়ার শুনে ও থমকে দাঁড়াল। "আমিও ইঞ্জিনিয়ার হব। কলকাতায় পড়ব।" তারপর একটু থেমে, গলাটা নামিয়ে বলল, "বাবা-মা নেই তো, দাদুই সব। দাদুকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে রাখব একদিন।"

কটেজটা দেখে আমরা তিনজনেই থমকে গেলাম।

গোটা ঘরটা কাচের। ঘরে ঢোকার দরজা বাঁদিকের দেওয়ালে, নুড়ির রাস্তাটার দিকে মুখ করে। দরজার ঠিক পাশে একটা ছোট খাট। ঘরের পিছনের দেওয়ালটা শুধু আসল দেওয়াল, ইট-সিমেন্টের, তার ওপারে বাথরুম। সেই দেওয়ালে ঠেস দিয়ে একটা বড় খাট। বড় খাটে বসলে সামনে পুরোটা কাচ, নিচে ঢাল নেমে গেছে ঘন জঙ্গলের দিকে। সামনের কাচে দুটো জানলা, একটা বাঁদিকে, একটা ডানদিকে। ডানদিকের দেওয়ালটাও কাচের, আর তার ওপারে পাহাড় উঠে গেছে সোজা ওপরে, ভুটানের দিকে। মাথার ওপরের ছাদও কাচের।

কিন্তু তখন সেই কাচের ভেতর দিয়ে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কাচের বাইরে চারদিকে, এমনকি ছাদের ওপরেও, মোটা মোটা বাঁশের চিক নামানো। দুপুরের রোদ চিকের ফাঁক দিয়ে ঢুকে মেঝেতে, খাটের চাদরে, আমাদের গায়ে সরু সরু সোনালি দাগ কাটছিল। ঘরটা আধো-অন্ধকার, আর বাইরের তুলনায় বেশ ঠান্ডা।

"এই তোর কাচের ঘর?" রোহন ইশানের দিকে তাকিয়ে বলল। "এ তো বাঁশের খাঁচা।"

"সন্ধ্যে হোক, স্যার। তারপর দেখবেন," সানি গর্বের সঙ্গে বলল, যেন কটেজটা ওর নিজের বানানো।

রোহন খাটে বসে গিটার বার করল। ইশান চিকের ফাঁক দিয়ে বাইরের ছবি তোলার চেষ্টা করে করে শেষে হাল ছেড়ে দিল। আর আমি কটেজের সিঁড়িতে বসে ছিলাম, যখন দেখলাম সানি একটা ভাঁজ-করা অঙ্কের খাতা হাতে ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে আছে।

"দাদা, একটা জিনিস দেখিয়ে দেবে? জ্যামিতিটা মাথায় ঢোকে না। সামনের বছর মাধ্যমিক।"

পরের আধ ঘণ্টা আমি ওই সিঁড়িতে বসে নুড়িপাথর সাজিয়ে সাজিয়ে ওকে ত্রিভুজের উপপাদ্য বোঝালাম। প্রথমে ও ভুরু কুঁচকে ছিল। তারপর হঠাৎ একটা জায়গায় এসে ওর চোখ দুটো জ্বলে উঠল। "ও! এই ব্যাপার! এত সোজা!" সেই মুখটা আমি কোনওদিন ভুলব না।

সিঁড়িতে জ্যামিতির ক্লাস

সূর্য ডোবার একটু আগে সানি কোথা থেকে একটা বাঁশের মই জোগাড় করে আনল। তারপর কটেজের চারদিকে ঘুরে ঘুরে, একটা একটা করে চিকগুলো গুটিয়ে তুলতে লাগল। দড়ি টানছে, চিক গুটোচ্ছে, গিঁট দিচ্ছে, আবার পরেরটায় যাচ্ছে। কাজটা ও এত সহজে করছিল, যেন রোজ করে।

"রোজই তো করি," জিজ্ঞেস করতে ও হেসে বলল। "সন্ধ্যেয় আমি তুলি, আর সকালে রোদ চড়ার আগে দাদু এসে নামিয়ে দেয়। নইলে দুপুরে এ ঘর উনুন হয়ে যায়, স্যার।"

আর প্রতিটা চিক ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঘরটা যেন একটু একটু করে খুলে যাচ্ছিল। প্রথমে সামনের ঢাল আর নিচের জঙ্গল, সন্ধ্যের আলোয় গাঢ় সবুজ। তারপর ডানদিকের পাহাড়, মাথায় শেষ রোদটুকু লেগে আছে। শেষে সানি মই বেয়ে ছাদে উঠে মাথার ওপরের চিকগুলো গুটোল, আর হঠাৎ গোটা আকাশটা যেন ঘরের মধ্যে নেমে এল। গোলাপি থেকে বেগুনি, বেগুনি থেকে নীল।

ছাদের কিনারা থেকে ঝুঁকে সানি চেঁচিয়ে বলল, "এবার দেখুন, স্যার!"

ইশান খাটের ওপর চিত হয়ে শুয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে রইল। এই প্রথম দেখলাম, কোনও জায়গা দেখে ও ছবি তোলার কথা ভুলে গেছে।

যাওয়ার আগে আমি ওর খাতার শেষ পাতায় নিজের ফোন নম্বর লিখে দিলাম। "কলকাতায় এলে সোজা ফোন করবি। কোচিং, থাকার জায়গা, যা লাগে, আমি দেখে নেব।"

সানি পাতাটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর খাতাটা এমন যত্ন করে বন্ধ করল, যেন ওর মধ্যে কোনও দামি জিনিস রাখা আছে।

সন্ধ্যে নামল। নিচে, নদীর ধারের গ্রাম থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছিল। দশমী। ঠাকুর বিসর্জনে যাচ্ছে। অন্ধকারে মশালের আলোর একটা লাইন আস্তে আস্তে নদীর দিকে নামছে। দূর থেকে ভেসে এল, "আসছে বছর আবার হবে!" তারপর ঢাক থেমে গেল, আর চারপাশটা হঠাৎ এমন চুপ হয়ে গেল, যে নিজের নিঃশ্বাস শুনতে পাচ্ছিলাম।

চিক উঠতেই আকাশ নেমে এল

জানলার কাছে গিয়ে ফোনে এক দাগ নেটওয়ার্ক পেলাম। মাকে ফোন করে প্রণাম করলাম। মা বলল, "শুভ বিজয়া। সাবধানে থাকিস, নীলু।" আমার হাতের লাল সুতোটায় একবার হাত বুলিয়ে নিলাম।

রাতে কাচের ছাদের ওপারে এত তারা দেখলাম, যে কলকাতায় এক জীবনেও দেখিনি। রোহন আস্তে আস্তে গিটার বাজাচ্ছিল। ইশান ছবি আপলোড করতে না পেরে নেটওয়ার্ককে গালাগাল দিচ্ছিল।

শোয়ার আগে আমি নিজে উঠে সামনের দুটো জানলার ছিটকিনি তুলে দিলাম। দরজার ছিটকিনিও। অভ্যেস। কলকাতায় মা রোজ রাতে এই কাজটা করে, আর আমি সেটা দেখে দেখে বড় হয়েছি।

তারপর আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম।

২. ভোর চারটে তিপ্পান্ন

সত্যি বলছি, প্রথম আওয়াজটা শুনে ভেবেছিলাম মেঘ ডাকছে।

ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরে শুতে যাচ্ছিলাম। তারপর আবার এল। আর এবার বুঝলাম, এটা মেঘ না। মেঘ ডাকলে খাট কাঁপে না। মাথার ওপরের কাচ ঝনঝন করে না। আওয়াজটা আসছিল একদম কাছ থেকে। এত কাছ থেকে যে বুকের ভেতরটা পর্যন্ত গুমগুম করে উঠল।

চোখ খুলে দেখি তখনও অন্ধকার। পুরো অন্ধকার না, আকাশটা একটু একটু করে কালো থেকে নীল হচ্ছে। সেই ভোর হওয়ার ঠিক আগের সময়টা, যখন রাতও শেষ হয়নি, আবার সকালও আসেনি। কাচের ছাদের ওপারে তারাগুলো তখনও ঝুলে আছে, কিন্তু ফিকে হয়ে এসেছে।

ইশান আমার পাশে উঠে বসেছে। অন্ধকারেও বুঝতে পারছিলাম ওর মুখটা সাদা হয়ে গেছে। দরজার পাশের ছোট খাটে রোহন কম্বলটা গলা অবধি টেনে বসে আছে, চোখ দুটো গোল গোল।

"শুনলি?" রোহন ফিসফিস করে বলল।

শুনেছি তো। আবার শুনলাম। আরও কাছে।

আর একটা জিনিস খেয়াল করলাম। গোটা জঙ্গল একদম চুপ। কাল রাতেও ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজে কান ঝালাপালা হচ্ছিল, এখন একটা ঝিঁঝিঁ ডাকছে না। একটা রাতচরা পাখিও না। এমনকি হাওয়াটাও যেন থেমে গেছে। মনে হচ্ছিল গোটা পাহাড়টা দম বন্ধ করে বসে আছে। কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করছে।

বালিশের পাশ থেকে ফোনটা তুললাম। নেটওয়ার্ক নেই। কাল জানলার কাছে যে একটা দাগ পেয়েছিলাম, সেটাও নেই। স্ক্রিনে সময় দেখাচ্ছে, ভোর চারটে তিপ্পান্ন।

"ভাই, এটা বাঘ," ইশান বলল। বলেই নিজেই কেমন চমকে উঠল, যেন কথাটা মুখে আনা উচিত হয়নি।

"ধুর, কী বলছিস," রোহন বলল, কিন্তু ওর গলাটা কাঁপছিল। "চারপাশে একটা গাছও নেই, বাঘ এই খোলা জায়গায় আসবে কেন? নিশ্চয়ই অনেক দূরে..."

ওর কথা শেষ হল না। কারণ ঠিক তখনই বাঁদিকের কাচের ওপারে, দরজার একদম পাশে, অন্ধকারের একটা টুকরো আস্তে করে নড়ে উঠল।

৩. কাচের ওপারে

একটা বাঘিনী। মাঝারি সাইজের, লম্বা শরীর। দরজা থেকে হাত পাঁচেক দূরে, নুড়ির রাস্তাটার ঠিক মুখে, ঘাসের ওপর এসে আস্তে আস্তে বসে পড়ল। এমনভাবে বসল, যেন জায়গাটা ওর খুব চেনা। যেন রোজ এসে এখানেই বসে। রোহনের খাট আর ওর মাঝখানে শুধু একটা কাচ। ব্যস, আর কিছু না।

ভোরের আগে, দরজার পাশে

রোহন একদম নড়ল না। আমি শুধু ওর নিঃশ্বাসের আওয়াজ শুনছিলাম। ছোট ছোট, তাড়াতাড়ি।

তারপর ডানদিক থেকে এল দ্বিতীয় গর্জনটা।

ডানদিকে পাহাড়। ওদিকের কাচের ওপারের অন্ধকারটা হঠাৎ উঁচু হতে শুরু করল। উঁচু হচ্ছে তো হচ্ছেই, যতক্ষণ না আমাকে ঘাড় তুলে দেখতে হল। একটা বাঘ। কিন্তু বাঘ যে এত বড় হতে পারে, আমার কোনও ধারণা ছিল না। চিড়িয়াখানায় বাঘ দেখেছি, টিভিতে দেখেছি, কিন্তু এ অন্য জিনিস। পিছনের দু'পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠেছে, আর সামনের থাবা দুটো পৌঁছে গেছে কাচের দেওয়ালের একদম মাথার কাছে, ছাদের কিনারায়। অন্ধকারে ওর শুধু আকারটা বোঝা যাচ্ছিল। আর দুটো চোখ। আগুনের মতো না, পুরোনো সোনার মতো।

আর তারপর সে কাচটা আঁচড়াতে শুরু করল।

কাচের ওপারে

ওই আওয়াজটা আমি কোনওদিন ভুলব না। নখ দিয়ে কাচ ঘষার আওয়াজ। লম্বা, সরু, কানের ভেতর দিয়ে ঢুকে একদম দাঁতে গিয়ে লাগে। একবার। দু'বার। তিনবার। মনে হচ্ছিল ও খুঁজছে, কাচটা কোথায় সবচেয়ে দুর্বল।

ইশান আমার হাতটা খামচে ধরল। ওর নখ আমার চামড়ায় বসে যাচ্ছিল, আমি টেরও পাইনি। কারণ ঠিক তখনই আমার চোখ পড়ল সামনের দিকে।

সামনের ডানদিকের জানলাটা খোলা।

বেশি না, আধ ইঞ্চি মতো ফাঁক। কিন্তু খোলা। সেই ফাঁক দিয়ে ভোরের ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছিল, সঙ্গে ভেজা ঘাসের গন্ধ। আর আরও একটা গন্ধ। কাঁচা মাংসের মতো। লোহার মতো।

আর তার পাশে, সামনের বাঁদিকের জানলাটাও খোলা।

আমার মাথাটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো ফাঁকা হয়ে গেল। কাল রাতে আমি নিজে হাতে দুটো ছিটকিনি তুলেছিলাম। নিজে হাতে। ঠক, ঠক। আওয়াজটা পর্যন্ত মনে আছে। তাহলে খুলল কে?

ভাবার সময় ছিল না। খাট থেকে লাফিয়ে নামলাম। মেঝেটা বরফের মতো ঠান্ডা। তিন লাফে ডানদিকের জানলার কাছে গিয়ে পাল্লাটা টেনে বন্ধ করলাম। ছিটকিনি তুলতে গিয়ে হাত এমন কাঁপছিল যে প্রথমবার ফসকে গেল। দ্বিতীয়বারে লাগল। তারপর দৌড়ে বাঁদিকেরটায়। পাল্লা বন্ধ। ছিটকিনি। ঠক।

আর ঠিক সেই সেকেন্ডে বড় বাঘটা কাচের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

গোটা ঘরটা থরথর করে কেঁপে উঠল। মাথার ওপরের কাচে একটা ভোঁতা আওয়াজ এক কোণ থেকে আরেক কোণে গড়িয়ে গেল। আমি ভেবেছিলাম এই বুঝি ভাঙল। ভাঙল না। বাঘটা নেমে দাঁড়াল, আর গলার অনেক গভীর থেকে একটা গরগর আওয়াজ করতে লাগল। একটানা, থামছেই না। রাগের আওয়াজ না ঠিক। কেমন যেন অবাক হওয়ার আওয়াজ। যেন যা পাওয়ার কথা ছিল, তা পায়নি।

তারপর হঠাৎ সে ঘুরে দাঁড়াল আর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। নিচের দিকে, নুড়ির রাস্তাটা যেদিকে নেমে গেছে।

কোথায় গেল? কেন গেল? জানি না। আর না জানাটাই সবচেয়ে ভয়ের ছিল। কারণ এখন সে আর দেখা যাচ্ছে না। যে কোনও দিক থেকে আবার আসতে পারে।

বাঘিনীটা কিন্তু গেল না। দরজার পাশে যেমন বসে ছিল, তেমনই বসে রইল। চুপচাপ।

কীভাবে খাটে ফিরে এসেছিলাম মনে নেই। শুধু মনে আছে, ইশান সাইডটেবিলের ইন্টারকম ফোনটা তুলে রিসেপশনের নম্বর টিপছে। ওপাশে রিং হচ্ছে। একবার, দু'বার, দশবার। কেউ ধরছে না।

"রাতে তো একজন নাইট গার্ড থাকার কথা!" ইশান প্রায় কেঁদে ফেলে বলল। "ধরছে না কেন?"

আর ঠিক তখন, অনেক দূর থেকে, নিচের রাস্তার দিক থেকে, একটা আওয়াজ ভেসে এল। একটা মানুষের চিৎকার। খুব ছোট্ট। শুরু হয়েই যেন মাঝপথে কেউ কেটে দিল।

তারপর আবার সব চুপ।

আমরা তিনজন বড় খাটের ওপর জড়সড় হয়ে বসে রইলাম। রোহনও কখন যেন উঠে এসে আমাদের পাশে বসেছে, দরজার কাছের খাটে একা থাকার সাহস ওর ছিল না। কেউ কোনও কথা বলছিলাম না। আমি মনে মনে শুধু বলে যাচ্ছিলাম, ছোটবেলায় ঠাকুমা যেমন শিখিয়েছিল: আলো আসুক, আলো আসুক, একটু আলো আসুক। কতক্ষণ কেটেছিল জানি না। প্রতিটা সেকেন্ড মনে হচ্ছিল এক ঘণ্টা।

৪. প্রথম আলো

আলো এল ডানদিকের পাহাড়ের পিছন থেকে। প্রথমে একটা সরু সোনালি দাগ, পাহাড়ের মাথায়। তারপর সেটা আস্তে আস্তে নেমে এল, কাচ বেয়ে, ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।

আর সেই প্রথম আলোয় আমি বাঘিনীটাকে প্রথমবার ঠিক করে দেখলাম।

ও তখনও দরজার পাশে বসে। এক চুলও নড়েনি। সারা রাতের শিশির জমে আছে ওর কমলা লোমে। হাজার হাজার ছোট্ট ছোট্ট জলের ফোঁটা। সূর্যের প্রথম আলো সেই ফোঁটাগুলোয় পড়ে চিকচিক করছিল, আর মনে হচ্ছিল ওর গোটা শরীরটা ঘিরে একটা আলোর রিং তৈরি হয়েছে। ঠাকুরঘরে ঠাকুরের ছবির মাথার পিছনে যেমন একটা গোল আলো আঁকা থাকে, ঠিক তেমন। ওর গলায় একটা কালো মোটা বেল্ট, তাতে একটা ছোট বাক্স লাগানো। রেডিও কলার। মানে বনদপ্তর ওকে চেনে। রুদ্রবাবুর অ্যাপের ওই রঙিন বিন্দুগুলোর কোনও একটা।

প্রথম আলোয় বাঘিনী

ও আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। খুব শান্ত চোখে। প্রথমে রোহনের দিকে। তারপর ইশানের দিকে। তারপর আমার দিকে। একজন একজন করে। যেন গুনে নিচ্ছে, তিনজনই আছি কি না।

অদ্ভুত লাগছিল। ভয় লাগছিল ঠিকই, কিন্তু অন্যরকম ভয়। ওর চোখে খিদে ছিল না। রাগও ছিল না। ছিল কেমন একটা দুঃখ। আর মনে হচ্ছিল, ও আমাদের চেনে।

তারপর ডানদিকে আবার একটা ছায়া পড়ল।

বড় বাঘটা ফিরে এসেছে।

এবার সে চার পায়ে দাঁড়িয়ে, কাচ থেকে হাতখানেক দূরে, একদম আমার সামনে। আর এবার আলোয় আমি ওকে পুরোটা দেখতে পেলাম।

একটা মোষের চেয়েও বড়। কাঁধ দুটো এত উঁচু যে আমি খাটে বসে থেকেও ওর চোখের দিকে মুখ তুলে তাকাতে হচ্ছিল। গায়ের রং সাধারণ বাঘের মতো উজ্জ্বল কমলা না, কেমন পুরোনো তামার মতো। আর ডোরাগুলো। ডোরাগুলো সোজা না, এঁকেবেঁকে গেছে, ভাগ হয়ে গেছে, আবার মিশেছে। পুরোনো ম্যাপে যেমন কালো কালির নদী আঁকা থাকে, ঠিক তেমন। চোখ দুটো সেই পুরোনো সোনার রং। একবারও পলক পড়ছে না। আর কপালের ঠিক মাঝখানে, দুই ভুরুর ওপরে, একটা লম্বা লাল দাগ।

প্রথমে ভেবেছিলাম ওটাও রক্ত। কারণ ওর মুখ...

ওর গোটা মুখটা রক্তে মাখামাখি। থুতনি থেকে বুক অবধি। শুকনো রক্ত না, একদম টাটকা। গোঁফ বেয়ে টপটপ করে ঘাসে পড়ছিল। কিছুক্ষণ আগে যখন চলে গিয়েছিল, তখন ওর মুখে এক ফোঁটা রক্তও ছিল না। এটা আমি হলফ করে বলতে পারি।

আর ওর গলায় কোনও কলার নেই।

বড় বাঘ

আমরা তিনজন পাথরের মতো বসে রইলাম। নিঃশ্বাস নিচ্ছিলাম কি না, জানি না। মনে হচ্ছিল এটাই শেষ। পৃথিবীর শেষ সকাল।

বাঘটা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। শুধু আমার দিকে। এমনভাবে, যেন আমাকে কিছু একটা দেখাচ্ছে। যেন বলছে, দেখ।

তারপর, কোনও কারণ ছাড়াই, সে মুখ ঘুরিয়ে নিল আর ধীরে ধীরে সামনের ঢাল বেয়ে নিচের জঙ্গলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। একটুও তাড়াহুড়ো নেই। যেন কাজ শেষ। কয়েক পা যাওয়ার পর বাঘিনীটা উঠে দাঁড়াল। আমাদের দিকে আরেকবার তাকাল। তারপর চুপচাপ ওর পিছন পিছন চলে গেল।

দুটো কমলা রং নিচের গাছের সারির মধ্যে হারিয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমরা কেউ একটা কথাও বলিনি।

তারপর রোহন হঠাৎ হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল। আর আমরা দু'জনও আর পারলাম না।

৫. রিসেপশন

আধ কিলোমিটার নুড়ির রাস্তা আমরা দৌড়ে নেমেছিলাম। চটি পিছলে যাচ্ছিল, একবার রোহন পড়েও গেল, কিন্তু কেউ একবারও পিছনে তাকাইনি। মনে হচ্ছিল তাকালেই দেখব, ওই সোনালি চোখ দুটো আমাদের পিছন পিছন আসছে।

রিসেপশনের কাঠের বারান্দায় উঠে তবে দম ফেললাম।

রুদ্রবাবু কাউন্টারের পিছনে বসে চা খাচ্ছিলেন। আমাদের হাঁপাতে হাঁপাতে ঢুকতে দেখেও উনি কাপটা নামালেন না। শুধু চোখ তুলে তাকালেন। আর সেই চাহনিতে একটুও অবাক হওয়া ছিল না। ছিল কেমন একটা ক্লান্তি। যেন একটা সিনেমা উনি বহুবার দেখেছেন, আর সেটা আবার শুরু হয়েছে।

আমরা তিনজন একসঙ্গে কথা বলছিলাম। বাঘ, দুটো বাঘ, কাচ, আঁচড়, খোলা জানলা, ফোন কেউ ধরেনি, চিৎকার। রুদ্রবাবু চুপচাপ সব শুনলেন। তারপর ফোন বার করে সেই অ্যাপটা খুললেন, আর স্ক্রিনটা আমাদের দিকে ঘুরিয়ে ধরলেন।

ম্যাপে একটা লাল বিন্দুর লাইন। ডানদিকের পাহাড় থেকে নেমে, আমাদের কটেজের সামনে দিয়ে, নিচের জঙ্গলে ঢুকে গেছে।

"মোহিনী," উনি বললেন। "বনদপ্তরের কলার পরানো বাঘিনী। বছরের এই সময়টায় ভোরের দিকে এই রাস্তা দিয়ে নামে। কাউকে কিছু করে না। কাল রাতে একটাই বাঘ গেছে। এই দেখুন।"

"একটা না, দুটো!" ইশান প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। "আরেকটা ছিল, বিশাল বড়, মোষের মতো সাইজ! মুখে রক্ত!"

রুদ্রবাবু কাঁধ ঝাঁকালেন। "অ্যাপে তো নেই।"

আমরা টাকা ফেরত চাইলাম। অন্তত অন্য একটা ঘর, যেটার দেওয়াল ইটের। উনি মাথা নাড়লেন। "আমি বুঝতে পারছি আপনাদের কী হয়েছে। কিন্তু রিফান্ডের কোনও নিয়ম নেই। ওটা আমাদের পলিসি না।"

কথাগুলো উনি এমনভাবে বললেন, যেন মুখস্থ। যেন ঠিক এই কথাগুলো, ঠিক এই সুরে, আগেও অনেকবার বলেছেন।

তারপর যা হল, সেটা ভাবলে এখনও লজ্জা লাগে। আমার গলা ভেঙে গিয়েছিল। রোহন কাঁদছিল। ইশান কাউন্টারে ঘুসি মারছিল। আমরা প্রায় হাতজোড় করে অনুরোধ করছিলাম। কাল বিকেলে যে মানুষটা এত হেসে হেসে কথা বলছিলেন, আজ তাঁর মুখে একটা রেখাও নড়ছিল না।

আর আস্তে আস্তে লোক জমতে লাগল।

রান্নাঘর থেকে দু'জন রাঁধুনি বেরিয়ে এল। একজন মালি, হাতে খুরপি। কয়েকজন অন্য টুরিস্ট, ঘুম-চোখে, হাতে চায়ের কাপ। রিসেপশনের মেয়েটা কম্পিউটারে কী একটা টাইপ করছিল, একবারও মুখ তুলল না।

সবাই দাঁড়িয়ে দেখছিল। কিন্তু একটা জিনিস আমার খটকা লাগল। ওরা দেখছিল রুদ্রবাবুকে। আমাদের দিকে কেউ তাকাচ্ছিল না। একজন মহিলা ওঁর বাচ্চাটাকে টেনে নিজের পিছনে লুকিয়ে নিলেন। পিছন থেকে কেউ একজন খুব আস্তে বলল, "আবার শুরু হয়েছে।"

আরেকজন বলল, "নাইট গার্ডকে কেউ দেখেছ? রাতে তো ডিউটিতে ছিল। সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।"

বারান্দার জানলা দিয়ে নুড়ির রাস্তার মুখটা দেখা যায়। সেই শিমুল গাছ, সেই সিঁদুর মাখা কালো পাথর। আর পাথরের পাশে উবু হয়ে বসে আছেন বংশীকাকা। একমুঠো টাটকা গাঁদাফুল পাথরের ওপর রাখছিলেন, আর বিড়বিড় করে কী যেন বলছিলেন। একবার মুখ তুলে সোজা আমার দিকে তাকালেন। শুধু আমার দিকে। তারপর চোখ নামিয়ে নিলেন।

"ভাগ্যিস আমি জানলাগুলো বন্ধ করে দিয়েছিলাম," আমি ভাঙা গলায় বললাম। "নইলে ওই রক্তমাখা মুখ নিয়ে বড়টা আজ ঘরের ভেতরে ঢুকে আসত।"

রুদ্রবাবুর হাতের চায়ের কাপটা মাঝপথে থেমে গেল।

উনি খুব আস্তে কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন। আর এই প্রথম, সোজা আমার চোখের দিকে তাকালেন।

"কী বললেন?" ওঁর গলা প্রায় শোনাই যাচ্ছিল না। "জানলা... আপনি বন্ধ করেছেন? নিজে?"

আমি মাথা নাড়লাম।

"আর বড়টার মুখে... রক্ত ছিল?"

ওঁর মুখটা পুরো ছাইয়ের মতো হয়ে গেল। বাইরে, শিমুল গাছের নিচে, বংশীকাকার হাত থেকে গাঁদাফুলগুলো ঝরে পড়ল মাটিতে। উনি টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালেন, আর বুড়ো শরীরে যতটা পারা যায়, প্রায় দৌড়ে নুড়ির রাস্তা ধরে ওপরে উঠতে লাগলেন।

রুদ্রবাবু কাউন্টারের নিচ থেকে একটা টর্চ আর একটা পুরোনো দোনলা বন্দুক বার করলেন।

"চলুন," বললেন। "আমি আপনাদের সঙ্গে যাচ্ছি।"

৬. ওপরে ফেরা

ওপরে ওঠার রাস্তাটা এখন অন্যরকম লাগছিল। দিনের আলোয় দু'পাশের লম্বা ঘাস আর পাথরগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, কিন্তু মনে হচ্ছিল প্রত্যেকটা পাথরের পিছনে কিছু একটা ঘাপটি মেরে বসে আছে।

রুদ্রবাবু সবার আগে হাঁটছিলেন। বন্দুকটা দু'হাতে ধরা। প্রতি দশ পা অন্তর থেমে যাচ্ছিলেন, কান পেতে কিছু একটা শোনার চেষ্টা করছিলেন। একটু আগের সেই ঠান্ডা, নির্বিকার লোকটা যেন হাওয়া হয়ে গেছে। কপালে ঘাম, অথচ সকালের হাওয়া তখনও কনকনে।

"একটু আগে তো আপনি একটুও ভয় পাননি," আমি বললাম। "এখন পাচ্ছেন কেন?"

উনি অনেকক্ষণ কিছু বললেন না। সামনের দিকে তাকিয়েই হাঁটতে থাকলেন। একবারও আমাদের দিকে ঘুরলেন না। তারপর বললেন, "কারণ মোহিনীকে আমি চিনি। ওর গলায় কলার আছে, ও কোথায় আছে আমি সবসময় জানি। কিন্তু বড়টার কোনও কলার নেই। কোনও রেকর্ড নেই। বনদপ্তরের খাতায় ওর কোনও অস্তিত্বই নেই। ও এখন কোথায় লুকিয়ে আছে, আমি জানি না।"

"কিন্তু ও তো নিচে চলে গেল। আমরা নিজের চোখে দেখলাম।"

"এটা ওদের সিজনাল রাস্তা," উনি বললেন, যেন আমার কথাটা শুনতেই পাননি। "বছরের এই সময়টায় ভোরবেলা ওরা ডানদিকের পাহাড় থেকে নামে, কটেজের সামনের ঢাল দিয়ে নিচের জঙ্গলে যায়। কিন্তু ঢালের একদম ধার ঘেঁষে, দূর দিয়ে। এদিকটায় গাছ নেই, লুকোনোর জায়গা নেই। তাই কটেজের কাছে আসে না।" একটু থেমে খুব আস্তে বললেন, "সাধারণত।"

রাস্তার মাঝামাঝি একটা বাঁক আছে, যেখান থেকে নিচে রিসেপশন আর ওপরে কটেজ, দুটোই দেখা যায়। সেই বাঁকটা ঘুরতেই রোহন থমকে দাঁড়াল।

বংশীকাকা। রাস্তার ধারে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন, আর ওঁর সামনে ঘাসের মধ্যে পড়ে আছে একটা টর্চ। লম্বা, কালো, রাবারের হাতল। তখনও জ্বলছে। দিনের আলোয় ওর হলুদ আলোটা কেমন ফ্যাকাশে, অসহায় লাগছিল। টর্চের পাশে পড়ে আছে একটা ভাঁজ করা কাগজ, শিশিরে ভিজে নেতিয়ে গেছে।

টর্চের পাশ থেকে ঘাসগুলো দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। একটা চওড়া দাগ, যেন ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দাগটা ঢাল বেয়ে নেমে গিয়ে মিশেছে নিচের গাছের সারিতে। ঘাসের ডগায় ডগায় শিশির। আর শিশিরের সঙ্গে মিশে আছে লাল।

টর্চের হাতলে সাদা মার্কার দিয়ে বড় বড় করে লেখা: সানি।

বাঁকের মুখে টর্চ

আমার পা দুটো মাটিতে আটকে গেল।

"সানি?" আমি বললাম। "কাল বিকেলের সেই ছেলেটা? ও তো... ও তো একটা বাচ্চা! ও রাতে নাইট গার্ডের টর্চ নিয়ে এখানে কী করছিল?"

রুদ্রবাবু আমার দিকে তাকালেন না। কিছু বললেনও না।

বংশীকাকা কাগজটা তুলে নিলেন। খুব যত্ন করে, ভিজে ভাঁজগুলো যাতে ছিঁড়ে না যায়। তারপর টর্চ আর কাগজটা একসঙ্গে দু'হাতে বুকে চেপে ধরে দুলতে লাগলেন। আর একটাই কথা বলে যাচ্ছিলেন, বারবার, ফিসফিস করে: "সানি রে... ও সানি... ও আমার সানি..."

রুদ্রবাবু ওঁর কাঁধে হাত রাখলেন। "বংশীকাকা, বাড়ি যাও।"

উনি গেলেন না। উঠে দাঁড়ালেন, টর্চ আর কাগজটা বুকে নিয়ে, আর চুপচাপ আমাদের পিছন পিছন হাঁটতে লাগলেন।

আমরা আবার ওপরে উঠতে শুরু করলাম। আর তখনই আমি একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করলাম।

গোটা রাস্তায় ঘাসের ওপর শিশির জমে আছে। রুদ্রবাবুর জুতোর ছাপ সেই শিশিরে একদম পরিষ্কার পড়ছে। একটা, একটা, একটা, আমাদের সামনে সামনে। পিছনে বংশীকাকার খালি পায়ের ছাপ। কিন্তু মাঝখানে, যেখান দিয়ে আমরা তিনজন হাঁটছিলাম, সেখানে কোনও ছাপ নেই। শিশির যেমন ছিল, ঠিক তেমনই আছে।

আমি নিজেকে বোঝালাম, আমরা তো পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটছি। তাই ছাপ পড়ছে না। এটাই। আর কিছু না।

কাচঘরের সামনে পৌঁছে রুদ্রবাবু থামলেন। আর আমরা তিনজন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

দরজায় একটা তালা ঝুলছে। বাইরে থেকে লাগানো। পুরোনো, ভারী, পেতলের তালা।

"এটা কী?" ইশান বলল। "আমরা তো এই দরজা দিয়েই দৌড়ে বেরোলাম। মিনিট কুড়ি আগে। তালা দিল কে?"

রুদ্রবাবু কোনও উত্তর দিলেন না। কোমর থেকে চাবির গোছা বার করে একটা চাবি আলাদা করলেন। তাতে একটা কাগজের ট্যাগ বাঁধা, হলদে হয়ে গেছে। ওঁর হাত এত কাঁপছিল যে তিনবারের চেষ্টায় চাবিটা তালায় ঢুকল।

৭. ধুলো

দরজাটা খুলতেই একটা বদ্ধ, ভ্যাপসা গন্ধ নাকে এল। অনেকদিন হাওয়া না ঢোকা ঘরের গন্ধ। পুরোনো আলমারি খুললে যেমন গন্ধ বেরোয়, ঠিক তেমন।

আমরা ভেতরে ঢুকলাম। রুদ্রবাবু ঢুকলেন না। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে রইলেন। বংশীকাকা ওঁর পিছনে।

মেঝেতে ধুলো। মোটা ধুলো। এত মোটা যে আঙুল দিয়ে নাম লেখা যায়। কাচের কোণে কোণে মাকড়সার জাল, তাতে শুকনো পাতা আর মরা পোকা আটকে আছে। বড় খাটটা পরিপাটি করে পাতা, চাদরটা হলদেটে হয়ে গেছে, কিন্তু একটা ভাঁজও নষ্ট হয়নি। ছোট খাটটাও তাই। দেখে মনে হচ্ছিল কাল রাতে কেউ এখানে শোয়নি। অনেক, অনেক বছর কেউ শোয়নি।

মাথার ওপর তাকালাম। কাচের ছাদের ওপারে বাঁশের চিকগুলো এখনও আছে, কিন্তু পচে কালো হয়ে গেছে। দড়ি ছিঁড়ে কয়েকটা ফালাফালা হয়ে ঝুলছে, কয়েকটা খসে পড়ে আছে কাচের ওপর, তাতে শ্যাওলা জমেছে। চারদিকের দেওয়ালের চিকগুলোরও একই দশা, বেশিরভাগ খসে পড়ে নিচের ঘাসে মিশে গেছে। কাল সন্ধ্যেয় সানি যেগুলো এত যত্ন করে গুটিয়ে তুলেছিল।

আমাদের ব্যাগ নেই। রোহনের গিটার নেই। ইশানের চার্জার, যেটা সারারাত প্লাগে লাগানো ছিল, সেটাও নেই। সাইডটেবিলে ইন্টারকম ফোনটা আছে, কিন্তু ওর তারটা ছেঁড়া। প্লাস্টিক গলে শক্ত হয়ে গেছে।

"এটা অন্য ঘর," ইশান বলল। ওর গলাটা কেমন অদ্ভুত শোনাচ্ছিল, প্রায় হাসির মতো। "ভুল ঘরে নিয়ে এসেছে। পাশে নিশ্চয়ই আরেকটা আছে..."

কিন্তু পাশে আর কোনও ঘর নেই। পাহাড়ের এই কাঁধে শুধু এই একটা কটেজ। আমরা তিনজনেই সেটা জানতাম।

আমি সামনের জানলাগুলোর দিকে এগোলাম।

দুটো জানলাই বন্ধ। ছিটকিনি তোলা। আর গোটা ঘরে, এত ধুলোর মধ্যে, মাত্র দুটো জায়গায় ধুলো নেই। দুটো ছিটকিনির ওপর। সেখানে আঙুলের ছাপ। একদম টাটকা।

আমার আঙুলের ছাপ।

পিছন থেকে রুদ্রবাবুর একটা আওয়াজ শুনলাম। যেন কেউ ওঁর বুকে ঘুসি মেরেছে। বংশীকাকা চৌকাঠের কাঠ খামচে ধরে নিজেকে সামলালেন।

তারপর রোহন একটা আওয়াজ করল। ঠিক চিৎকার না, গলার মধ্যে আটকে যাওয়া একটা শব্দ। ও ডানদিকের কাচের দেওয়ালের দিকে আঙুল দেখাচ্ছিল।

আঁচড়ের দাগগুলো ওখানেই। ভোরবেলা যেখানে বড় বাঘটা দু'পায়ে দাঁড়িয়ে কাচ আঁচড়াচ্ছিল, ঠিক সেখানে। চারটে লম্বা, গভীর দাগ, পাশাপাশি। ছাদের কাছ থেকে নেমে এসেছে প্রায় মেঝে অবধি। এত গভীর যে কাচের ভেতরে সাদা হয়ে গেছে।

কিন্তু দাগগুলো কাচের এপাশে। ভেতরের দিকে।

ভেতরের দিকের আঁচড়

আর দাগগুলোর ঠিক নিচে, মেঝের কাঠে, ধুলোর তলায় একটা বিশাল কালচে ছোপ। কাঠের মধ্যে এমনভাবে শুষে গেছে যে আর কোনওদিন উঠবে না।

আমি ঘুরে দাঁড়ালাম, আর চোখ পড়ল সাইডটেবিলের ওপর। ফোনটার পাশে, ধুলোয় ঢাকা, একটা হাতঘড়ি। স্টিলের ব্যান্ড। কাচটা মাকড়সার জালের মতো ফেটে গেছে। ঘড়িটা আমি চিনি। প্রথম চাকরি পাওয়ার পর বাবা দিয়েছিল। পিছনে আমার নামের প্রথম অক্ষরটা খোদাই করা।

কাঁটা দুটো থেমে আছে। চারটে বাহান্ন।

আমি দরজার দিকে তাকালাম। রুদ্রবাবু তখনও চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। পিছন থেকে সকালের রোদ এসে পড়েছে, আর কাচের দেওয়ালে আয়নার মতো ওঁর ছবি ভেসে উঠেছে। খাকি জ্যাকেট, বন্দুক, সব পরিষ্কার। পাশে বংশীকাকার ছবিও, বুকে টর্চ চেপে ধরা।

কিন্তু ওঁদের পাশে, যেখানে আমাদের তিনজনের ছবি থাকার কথা, কাচটা একদম ফাঁকা।

রুদ্রবাবু জ্যাকেটের ভেতরের পকেট থেকে মানিব্যাগ বার করলেন। তার ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা, প্লাস্টিকে মোড়া খবরের কাগজের টুকরো। অনেক পুরোনো। ভাঁজের জায়গাগুলো প্রায় ছিঁড়ে আসছে। দেখেই বোঝা যায়, উনি এটা বহু বছর ধরে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছেন। উনি কাগজটা চৌকাঠের ওপর রাখলেন। ঘরের ভেতরে এক পা-ও না ফেলে।

আমি ঝুঁকে পড়লাম।

ডুয়ার্সের নীলগড়ে বাঘের হানা: কাচের কটেজে কলকাতার তিন যুবকের মৃত্যু

তারিখ: ১২ অক্টোবর, ২০১৬। বিজয়া দশমীর পরের সকাল।

নিচে তিনটে নাম। ইশান দত্ত, ২৫। রোহন মিত্র, ২৬।

আর নীল সেন, ২৬।

আমার নাম।

৮. উত্তর রায়

কতক্ষণ ওই কাগজটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, জানি না। পিছনে ইশান একটানা বলে যাচ্ছিল, "না, না, না, না..." যেন ভাঙা রেকর্ড। রোহন ধুলোর ওপর বসে পড়েছিল, দু'হাতে মুখ ঢেকে।

দশ বছর। আমরা দশ বছর ধরে মরে আছি। আর জানতামই না।

আর হঠাৎ সব জায়গামতো বসে গেল। রিসেপশনে রুদ্রবাবুকে কেন অন্যরকম লাগছিল। কালকের সেই হাসিখুশি, হাত নেড়ে কথা বলা মানুষটা আর আজকের এই মানুষটার মাঝখানে দশটা বছর। দাড়িতে পাক, চোখের নিচে কালি, কপালে ভাঁজ। আর সানি। ষোলো বছরের যে ছেলেটা কাল বিকেলে আমার কাছে জ্যামিতি শিখছিল, সে এখন ছাব্বিশ। এই রিসর্টের নাইট গার্ড। আমার কাছে কালকের বিকেল, ওদের কাছে দশ বছর আগের।

"কেন?" আমি রুদ্রবাবুর দিকে তাকিয়ে বললাম। গলা দিয়ে ঠিক করে আওয়াজ বেরোচ্ছিল না। "কেন আমরা?"

রুদ্রবাবু কিছু বলার আগেই বংশীকাকা কথা বললেন। চৌকাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে, সানির টর্চ আর সেই ভেজা কাগজটা তখনও বুকে চেপে ধরে।

"এই পাহাড়টা মানুষের না, বাবা," উনি বললেন। গলাটা খসখসে, নিচু। কিন্তু প্রত্যেকটা কথা পরিষ্কার। "এটা বড়কর্তার।"

রুদ্রবাবু দেওয়ালে হেলান দিলেন। ওঁর গলাটা এখন একদম অন্যরকম। কোনও ব্যবসায়ীর গলা না। একজন ক্লান্ত মানুষের গলা।

"সুন্দরবনের কথা জানেন তো?" উনি বললেন। "ওখানে মৌলেরা, মানে যারা জঙ্গলে মধু কাটতে যায়, আর বাওয়ালিরা, যারা কাঠ কাটে, জঙ্গলে ঢোকার আগে বনবিবির পুজো দেয়। কারণ ওখানকার জঙ্গলের মালিক দক্ষিণ রায়। বাঘের দেবতা। অনেকে আজও মাথার পিছনে একটা মুখোশ পরে জঙ্গলে ঢোকে, যাতে বাঘ পিছন থেকে এসে ভাবে, লোকটা ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। আর ওখানে একটা গল্প সবাই জানে। দুখের গল্প। দুখে ছিল একটা গরিব ছেলে। ধোনা নামে এক মধুর ব্যবসায়ী ওকে সঙ্গে করে জঙ্গলে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর এক নৌকো মধুর লোভে ওকে একটা দ্বীপে একা ফেলে চলে এসেছিল। দক্ষিণ রায়ের ভোগ হিসেবে। দুখে কাঁদতে কাঁদতে বনবিবিকে ডেকেছিল, আর বনবিবি এসে ওকে বাঁচিয়েছিলেন।"

"ওটা দক্ষিণের গল্প," বংশীকাকা আস্তে বললেন। "আমাদের পাহাড়ে বনবিবি নেই, বাবা। আমাদের আছেন উত্তর রায়।"

উনি একটু থামলেন। নামটা যেন মুখে আনতেও কষ্ট হচ্ছিল।

"গাঁয়ের লোক নামটা মুখে আনে না। বলে বড়কর্তা। কিন্তু ওঁর নাম উত্তর রায়। আর উনি দক্ষিণ রায়ের মতো না।"

তারপর উনি গল্পটা বললেন। ধীরে ধীরে, যেমন গ্রামের বুড়োরা বলে, যেন ছোটবেলায় বহুবার শোনা গল্প আবার শোনাচ্ছেন।

অনেক অনেক কাল আগে, হিমালয়ে মা উমা তপস্যায় বসেছিলেন। মহাদেব একবার মজা করে ওঁকে কালো বলেছিলেন, সেই অভিমানে মা ঠিক করেছিলেন, তপস্যা করে গৌরী হবেন। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। একদিন একটা বাঘ এল। না খেতে পেয়ে পাঁজর বেরিয়ে গেছে, পেটে আগুন জ্বলছে। সামনে একা একজন মেয়ে বসে আছে, চোখ বন্ধ, নড়ছে না। খুব সহজ শিকার।

কিন্তু বাঘটা থমকে গেল। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ওর মনে হল, এঁর তপস্যা ভাঙা যায় না। তাই সে বসে রইল। অপেক্ষা করল। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। খিদেয় শরীর শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল, তবু সে উঠল না। মা যখন তপস্যা শেষ করে চোখ খুললেন, দেখলেন সামনে একটা বাঘ, মরতে বসেছে, কিন্তু এক পা-ও এগোয়নি।

মা খুশি হয়ে বাঘটার কপালে হাত রাখলেন। সেখানে একটা লাল দাগ পড়ে গেল, সিঁদুরের মতো। তারপর বললেন, "তুই আমার জন্য না খেয়ে অপেক্ষা করেছিস। আজ থেকে তুই আমার বাহন। আর তোর খিদে মেটাবে মানুষ। কিন্তু একটা শর্ত। জোর করে কিছু নিবি না। মানুষ নিজে থেকে যা তোকে দেবে, শুধু সেটুকুই তোর।"

মায়ের তপস্যা আর অপেক্ষারত বাঘ

"কিন্তু মা দুর্গার বাহন তো সিংহ," ইশান বলল। এত কিছুর মধ্যেও ওর গলায় সেই পুরোনো তর্ক করার অভ্যেসটা ফিরে এসেছিল। "বাঘ না।"

বংশীকাকার মুখে একটা ক্লান্ত হাসি ফুটল। "তোমাদের কলকাতার প্যান্ডেলে সিংহ, বাবা। সমতলে মা সিংহে চড়েই আসেন, ওটাই ঠিক। কিন্তু মা তো শুধু এক জায়গার না। যে মানুষ মা-কে যেভাবে চেনে, সে সেভাবেই পুজো করে।"

"উনি ঠিকই বলছেন," রুদ্রবাবু বললেন। "উত্তরে, পাহাড়ের দিকে গেলে দেখবেন, লোকে মা-কে বলে শেরাওয়ালি। বৈষ্ণোদেবীর ক্যালেন্ডারের ছবিগুলো মনে করে দেখুন, মা বাঘের পিঠে বসে আছেন। আর এই গ্রামের পুরোনো মন্দিরে মায়ের যে পাথরের মূর্তিটা আছে, তাঁর পায়ের কাছেও সিংহ নেই। বাঘ খোদাই করা। আমি ছোটবেলায় ভাবতাম, শিল্পী ভুল করেছে।"

"ভুল না," বংশীকাকা বললেন। "সিংহ মায়ের যুদ্ধের বাহন। মহিষাসুরকে মারতে মা সিংহে চড়েছিলেন। আর বাঘ মায়ের ধৈর্যের বাহন। মায়ের তপস্যার সাক্ষী। সমতলে মা আসেন অসুর মারতে, তাই সিংহ। পাহাড়ে মা থাকেন তপস্যায়, তাই বাঘ।"

উনি একটু থামলেন।

"সেই বাঘই উত্তর রায়।"

আমার মনে পড়ে গেল, ভোরের আলোয় বড় বাঘটার কপালের সেই লম্বা লাল দাগ। আমি ভেবেছিলাম রক্ত।

তাই প্রতি বছর পুজোর চারদিন মা যখন সিংহে চড়ে বাপের বাড়ি আসেন, উত্তর রায় পাহাড়ে থেকে যান, হিমালয়ের দরজা পাহারা দেন। আর দশমীর দিন মা যখন কৈলাসে ফিরে যান, তার পরের ভোরে উনি ওপারের শিরা থেকে নেমে আসেন। এই ঢাল বেয়ে, নিচের জঙ্গলে। এক বছরের পাওনা বুঝে নিতে। যারা ওঁর পাহাড়ে থাকে, তাদের কাছ থেকে।

"কাল দশমী ছিল," আমি ফিসফিস করে বললাম। তারপর মনে পড়ল, কাল না। দশ বছর আগে। আর আজও।

"আমি একবার ওঁকে দেখেছি," বংশীকাকা বললেন। "দশ বছর বয়সে। বাবার সঙ্গে ওই শিমুলতলার পাথরের পিছনে লুকিয়ে ছিলাম। ভোর হচ্ছে, হঠাৎ সব পাখি চুপ। হাওয়া থেমে গেল। তারপর উনি নেমে এলেন। একটা মোষের চেয়েও বড়। গায়ের রং পুরোনো তামার মতো। ডোরাগুলো যেন পুরোনো ম্যাপের নদী। আর কপালে মায়ের সেই লাল দাগ। আমার পাশ দিয়ে গেলেন, এত কাছ দিয়ে যে গায়ের গরম টের পেলাম। একবার আমার দিকে তাকালেন। সোনার মতো চোখ। তারপর চলে গেলেন। বাবা বলেছিল, উনি দেখে গেলেন আমি কে। পরে কখনও যদি আমি ভোগ দিই, উনি চিনতে পারবেন।"

"নব্বইয়ের দশকে বনদপ্তর একবার ওঁকে কলার পরানোর চেষ্টা করেছিল," রুদ্রবাবু বললেন, খুব আস্তে। "ঘুমের ওষুধ দিয়ে, অনেক কষ্টে। পরের দিন সকালে কলারটা পাওয়া গিয়েছিল ওই শিমুলতলার পাথরের পাশে। বন্ধ। একটা দাগও নেই, কোথাও ছেঁড়েনি। যেন উনি ওর ভেতর থেকে গলে বেরিয়ে গেছেন। তারপর থেকে আর কেউ চেষ্টা করেনি।" উনি শুকনো হাসলেন। "আমার অ্যাপে একটাই বাঘ দেখায়, কারণ দেবতাকে জিপিএসে ধরা যায় না।"

"আর মোহিনী?" রোহন মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল। ওর গলা ভাঙা। "ও কে?"

বংশীকাকার মুখটা একটু নরম হল।

অনেক কাল আগে, এক বছর পাহাড়ে খুব আকাল হয়েছিল। বৃষ্টি হয়নি, ফসল হয়নি, গ্রামে মোষ তো দূরের কথা, একটা ছাগলও ছিল না যে দশমীর পরের ভোরে উত্তর রায়কে দেবে। গ্রামের লোক জানত, ভোগ না পেলে কী হয়। উনি নিজে কাউকে ছোঁন না, মায়ের শর্ত। কিন্তু ওঁর না-মেটা খিদে নেমে আসে গোটা পাহাড়ে। ঝোরা শুকিয়ে যায়, গাছ মরে, বাচ্চারা অসুখে পড়ে। আকালের বছরে তার মানে একটাই, গ্রামটা আর থাকবে না।

সেই গ্রামে একটা মেয়ে ছিল। ষোলো বছর বয়স। নাম মোহিনী। দশমীর রাতে কাউকে কিছু না বলে, একা একা পাহাড়ে উঠে গিয়েছিল। ভোরবেলা শিরার মাথায় দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে বলেছিল, "আমাকে নাও। গ্রামটাকে ছেড়ে দাও।"

শিরার মাথায় মোহিনী

উত্তর রায় ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। অনেকক্ষণ। এতদিন উনি শুধু ভয়ের ভোগ পেয়েছেন। মানুষ ভয়ে মোষ দিয়েছে, ছাগল দিয়েছে। কিন্তু কেউ কোনওদিন ভালোবেসে নিজেকে দেয়নি। উনি মোহিনীকে খেলেন না। মায়ের কাছে নিয়ে গেলেন। আর মা মোহিনীকে আশীর্বাদ করে বাঘিনী বানিয়ে দিলেন। সেদিন থেকে মোহিনী উত্তর রায়ের আগে আগে হাঁটে। ও দেখে, কোন ভোগ সত্যি দেওয়া হয়েছে, আর কোনটা নয়। আর উত্তর রায় যাদের নেন, তাদের আত্মাকে ও পথ দেখিয়ে শিরার ওপারে, মায়ের কাছে নিয়ে যায়।

"মোহিনী রাস্তা দেখায়," বংশীকাকা বললেন। "বড়কর্তা নেন। প্রতি পুরুষে বাঘিনী বদলায়, কিন্তু গাঁয়ের লোক জানে, ও একজনই।"

"কয়েক বছর আগে বনদপ্তর যখন একটা বাঘিনীর গলায় কলার পরাল," রুদ্রবাবু বললেন, "এক নতুন অফিসার গ্রামের গল্প শুনে মজা করে তার নাম রেখেছিল মোহিনী। ও জানত না, নামটা ও দেয়নি। নামটা আগে থেকেই ছিল।"

আমার মনে পড়ল, ভোরবেলা মোহিনী কীভাবে একজন একজন করে আমাদের দিকে তাকিয়েছিল। যেন গুনে নিচ্ছে। আর ওর চোখের সেই দুঃখটা।

"তাহলে এই ঘরটা?" আমি বললাম। "এই কাচের ঘর?"

রুদ্রবাবু চারপাশের কাচের দেওয়ালগুলোর দিকে তাকালেন, যেন প্রথমবার দেখছেন।

"আমার ঠাকুর্দা হরিনারায়ণ রায়চৌধুরী এই এলাকার জমিদার ছিলেন। আর নামকরা শিকারি। উনি ঠিক এই কাঁধে, উত্তর রায়ের রাস্তার ওপর, একটা শিকারের বাংলো বানাতে চেয়েছিলেন। গ্রামের লোক বাধা দিয়েছিল। শেষে গ্রামের পুরোহিত মাঝখানে পড়ে একটা চুক্তি করিয়ে দিলেন। বাংলো তৈরি হবে। কিন্তু তার বদলে, প্রতি বছর দশমীর পরের ভোরে, গোটা পাহাড়ের হয়ে উত্তর রায়ের পাওনা দেবে রায়চৌধুরীরা।"

চুক্তিটা ছিল এরকম। দশমীর রাতে এই কাচের ঘরে একটা মোষ বাঁধা থাকবে। শিমুলতলার পাথরে সিঁদুর, রাস্তায় গাঁদাফুল। আর এই ঘরের জানলা খোলা থাকবে।

"জানলা খোলা থাকা মানে," বংশীকাকা বললেন, "ভেতরে যা আছে, তা ওঁকে দেওয়া হল। জানলা বন্ধ মানে, ওটা ওঁর নয়। এই কাচ ভাঙা ওঁর কাছে কিছুই না, বাবা। একটা থাবায় গুঁড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু উনি বন্ধ জানলা কখনও ভাঙেন না। মায়ের শর্ত। জোর করে কিছু নেবেন না।"

আমি ডানদিকের কাচের আঁচড়গুলোর দিকে তাকালাম। আজ ভোরে উনি কাচ আঁচড়েছিলেন। ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু ভাঙেননি। কেন ভাঙেননি, এখন বুঝলাম।

"ঠাকুর্দা ঘরটা কাচ দিয়ে বানিয়েছিলেন একটাই কারণে," রুদ্রবাবু বললেন। "যাতে উনি বাইরে থেকে দেখতে পান, ভেতরে কী রাখা আছে। এটা কোনওদিন শোয়ার ঘর ছিল না। এটা ভোগঘর। খাট দুটো আমার আনা। বাইরের চিকগুলোও আমার লাগানো, যাতে দিনের রোদে ঘরটা সেদ্ধ না হয়। ঠাকুর্দার আমলে এই ঘরে একটাই জিনিস থাকত। মোষ বাঁধার একটা খুঁটি।" উনি একটু থেমে বড় খাটটার দিকে তাকালেন। "খুঁটির গর্তটা এখনও আছে। ওই খাটের ঠিক নিচে।"

ষাট বছর এই নিয়ম চলেছিল। প্রথমে বংশীকাকার বাবা করতেন, তারপর বংশীকাকা নিজে। প্রতি বছর একটা মোষ। আর ষাট বছরে এই পাহাড়ে বাঘের হাতে একটা মানুষও মরেনি। গ্রামের কেউ না, কোনও টুরিস্টও না।

তারপর রুদ্রবাবু ফিরলেন। কলকাতায় বড় হওয়া, পড়াশোনা করা মানুষ। পুরোনো বাংলোটাকে রিসর্ট বানালেন। বনদপ্তরের সঙ্গে মিলে অ্যাপ বানালেন। আর মোষ বলি, সিঁদুর, খোলা জানলা, এসব ওঁর কাছে ছিল নিছক গ্রাম্য কুসংস্কার, আর একটা অবলা জন্তুকে প্রতি বছর মেরে ফেলার নিষ্ঠুর নিয়ম। ২০১৬ সালে উনি নিয়মটা বন্ধ করে দিলেন। ভোগঘরটাকে বানালেন রিসর্টের সবচেয়ে দামি কটেজ। দুটো খাট ঢোকালেন, বাইরে বাঁশের চিক লাগালেন। দিনে চিক নামানো থাকবে, সন্ধ্যেয় গুটিয়ে তোলা হবে, আর অতিথিরা কাচের ছাদের নিচে শুয়ে তারা দেখবে। এর চেয়ে ভালো বিক্রির জিনিস আর হয় না।

"বংশীকাকা আমার পায়ে পড়েছিল," রুদ্রবাবু বললেন। ওঁর গলা ভেঙে আসছিল। "বলেছিল, বাবু, ভোগ না পেলে ওঁর খিদে পাহাড়ে নামবে। গ্রাম বাঁচবে না। আমি হেসেছিলাম। বলেছিলাম, কাকা, এটা ২০১৬ সাল। বাঘের গলায় জিপিএস লাগানো আছে।"

উনি একটু থামলেন।

"সেই বছর পুজোর সিজনে এই কটেজের প্রথম বুকিংটা এসেছিল কলকাতার তিনটে ছেলের। দশমীর রাতের জন্য।"

আমি জানলার ছিটকিনিগুলোর দিকে তাকালাম। আমার পরিষ্কার মনে আছে, সেই রাতে আমি ওগুলো নিজের হাতে বন্ধ করে শুয়েছিলাম। মায়ের মতো করে। ঠক, ঠক।

তাহলে খুলেছিল কে?

চৌকাঠের বাইরে বংশীকাকার হাতে সানির টর্চটা থরথর করে কাঁপছিল।

৯. সানি

"আমি জানতাম," বংশীকাকা বললেন। খুব আস্তে। "দশ বছর ধরে জানতাম। কাউকে বলিনি।"

রুদ্রবাবু ঘুরে ওঁর দিকে তাকালেন। যেন ঠিক শুনতে পাননি।

বংশীকাকা চৌকাঠের পাশে বসে পড়লেন। টর্চটা কোলের ওপর রাখলেন। আর সানির কথা বললেন। গোড়া থেকে।

সানির বয়স যখন পাঁচ, এক বর্ষায় ধস নেমে ওর বাবা-মা দু'জনেই চলে যায়। তারপর থেকে বংশীকাকাই ওর সব। মা, বাবা, দাদু, বন্ধু। রাতে কারেন্ট চলে গেলে বংশীকাকা হ্যারিকেন জ্বেলে ওকে গল্প শোনাতেন। আর পাহাড়ের বুড়োরা যে গল্প জানে, সেটাই শোনাতেন। উত্তর রায়ের গল্প। মোহিনীর গল্প। ভোগ না পেলে পাহাড়ের কী হয়, সেই গল্প।

"আমিই ওর মাথায় ভয়টা ঢুকিয়েছিলাম, বাবা," বংশীকাকা বললেন। "আমিই।"

২০১৬-য় রুদ্রবাবু যখন নিয়মটা বন্ধ করলেন, সানি ভয়ে কাঁটা হয়ে গিয়েছিল। রাতে ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠত। বলত, "দাদু, এবার ঝোরা শুকিয়ে যাবে। গ্রামে অসুখ হবে। তুমি মরে যাবে।" বংশীকাকা ওকে বকতেন, বলতেন, চুপ কর, কিছু হবে না। কিন্তু উনি নিজেও জানতেন, কিছু একটা হবে।

দশমীর বিকেলে সানি আমাদের ব্যাগ বয়ে এনেছিল। আমার কাছে জ্যামিতি শিখেছিল। খাতার শেষ পাতায় আমার ফোন নম্বর নিয়েছিল। আর সেই রাতেই দাদুর কোমর থেকে কটেজের বাড়তি চাবিটা চুরি করেছিল।

রাত তিনটের সময় খালি পায়ে নুড়ির রাস্তা দিয়ে উঠে এসেছিল। দরজা খুলে আস্তে আস্তে ভেতরে ঢুকেছিল। আমরা তিনজন তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছি। ও চুপিচুপি সামনের দুটো জানলার ছিটকিনি নামিয়ে, পাল্লা দুটো একটু ফাঁক করে দিয়েছিল। তারপর বেরিয়ে গিয়ে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। যাতে আমরা উঠে পড়লেও বেরোতে না পারি।

ভোর চারটে বাহান্ন।

কেউ কোনও কথা বলল না। শুধু রোহনের কান্নার আওয়াজ। আর ইশান দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, চোখ বন্ধ।

আমার ভেতরে কী হচ্ছিল, ঠিক বলে বোঝাতে পারব না। রাগ? হ্যাঁ, রাগ। কিন্তু তার সঙ্গে চোখের সামনে ভাসছিল একটা মুখ। নুড়িপাথর সাজাতে সাজাতে হঠাৎ জ্বলে ওঠা দুটো চোখ। "ও! এই ব্যাপার! এত সোজা!" যে ছেলেটা ওই কথাটা বলেছিল, সেই ছেলেটাই কয়েক ঘণ্টা পরে এসে আমার মাথার কাছের জানলাটা খুলে দিয়ে গেছে।

"ও ষোলো বছরের একটা ভয় পাওয়া বাচ্চা ছিল, বাবা," বংশীকাকা বললেন। "ও ভেবেছিল, তিনটে অচেনা লোকের বদলে গোটা গ্রামটা বাঁচবে। ওর দাদু বাঁচবে।" উনি থামলেন। "কিন্তু তোমরা অচেনা ছিলে না। আর সেটাই ওকে দশ বছর ধরে খেয়েছে।"

পরের দিন সকালে খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই সানি বাড়ি ফিরে দাদুর পায়ের কাছে বসে পড়েছিল। হাতে সেই অঙ্কের খাতা, শেষ পাতাটা খোলা। সব বলেছিল। আর বংশীকাকা চুপ করে রইলেন। পুলিশকে কিছু বললেন না, রুদ্রবাবুকেও না। নাতি তো। আর একবার ভোগ দেওয়া হয়ে গেলে, সেটা আর ফেরানো যায় না।

"কিন্তু উত্তর রায় দেনা-পাওনায় কখনও ভুল করেন না," বংশীকাকা বললেন। "দুখের গল্পটা মনে আছে? ধোনা যে প্রাণটা ভোগ দিয়েছিল, সেটা ওর নিজের ছিল না। পাহাড়েরও একই নিয়ম, বাবা। যে অন্যের প্রাণ নিজের বলে ভোগ দেয়, সেই ভোগ আসলে চুরির ভোগ। মোহিনী সেই আত্মাদের মায়ের কাছে নিয়ে যেতে পারে না। ওরা আটকে থাকে। আর দেনাটা থেকে যায় যে দিয়েছে, তার মাথার ওপর। একদিন না একদিন সেটা শোধ হয়।"

আটকে থাকে। আমি মোহিনীর চোখের সেই দুঃখটার কথা ভাবলাম। প্রতি বছর ও দরজার পাশে এসে বসত, আমাদের গুনত, আর জানত, আমাদের নিয়ে যেতে পারবে না।

আর তারপর সানি আর থামেনি।

রুদ্রবাবু মোষ বলি আর কোনওদিন হতে দেননি। তাই প্রতি বছর দশমীর রাতে সানি চুপিচুপি ওপরে উঠে আসত। তালা খুলত। খালি কাচঘরের জানলাগুলো খুলে দিত। একটা খালি ঘর, যেখানে আর কোনও মানুষ শোয় না।

কিন্তু ঘরটা খালি ছিল না।

প্রতি বছর দশমীর পরের ভোরে আমরা তিনজন ফিরে আসতাম। ঘুম ভেঙে উঠতাম, বাঘ দেখতাম, খোলা জানলা দেখতাম। আর প্রতি বছর উত্তর রায় চুক্তির নিয়মে সেই খোলা জানলা দিয়ে ঢুকে আমাদের নিয়ে যেতেন। আবার। আমাদের কিচ্ছু মনে থাকত না। শুধু কাচের ভেতরের আঁচড়গুলো প্রতি বছর একটু একটু করে গভীর হত।

আর পাহাড় বেঁচে থাকত। দশ বছরে একবারও ঝোরা শুকোয়নি। একটা বাচ্চাও অসুখে মরেনি। গোটা গ্রাম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে, আর জানতেও পারেনি, কার দামে।

সানি আর মাধ্যমিক দেয়নি। কলকাতায় যায়নি। আঠারো বছর হতেই এই রিসর্টে নাইট গার্ডের চাকরি নিয়েছিল, যাতে কটেজটার কাছাকাছি থাকতে পারে। যাতে কেউ কোনওদিন কিছু টের না পায়। প্রতি বছর জানলা খুলে দেওয়ার পর ও রাস্তার মাঝখানের ওই বাঁকটায় বসে থাকত। ভোর হওয়া পর্যন্ত। আর কাঁদত।

বংশীকাকা কোলের ওপর থেকে সেই ভেজা কাগজটা তুললেন। খুব সাবধানে ভাঁজ খুললেন। তারপর হাত বাড়িয়ে চৌকাঠের ওপর রাখলেন, আমার দিকে মুখ করে।

একটা অঙ্কের খাতার ছেঁড়া পাতা। হলদে হয়ে গেছে, ভাঁজের জায়গাগুলো প্রায় ছিঁড়ে আসছে। শিশিরে ভিজে কালি একটু ছড়িয়ে গেছে, কিন্তু পড়া যাচ্ছে। আমার হাতের লেখা।

কলকাতায় এলে ফোন করিস। নীলদা। তার নিচে আমার ফোন নম্বর।

খাতার শেষ পাতা

"দশ বছর এটা বুকপকেটে নিয়ে ঘুরেছে," বংশীকাকা বললেন। "একবারও ফোন করেনি। কোন মুখে করবে?"

আমি পাতাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর এই প্রথম, সেই সকাল থেকে, আমার চোখ দিয়ে জল এল। রাগে না। অন্য কিছুতে।

রুদ্রবাবু এসব কিছুই জানতেন না। উনি শুধু জানতেন, প্রতি বছর দশমীর পরের ভোরে রিসেপশনের ফোনটা বেজে ওঠে। এই ঘরের লাইন থেকে, যেটা দশ বছর ধরে কাটা। তারপর তিনটে ছেলে দৌড়ে রিসেপশনে আসে, দুটো বাঘের কথা বলে, রিফান্ড চায়। প্রথম বছর উনি ভয়ে যা বলেছিলেন, প্রতি বছর ঠিক সেই কথাগুলোই বলেন। কারণ অন্য কিছু বললে কী হবে, উনি জানেন না। স্টাফদের শেখানো আছে, এই একটা দিন রিসেপশনের দিকে তাকাবে না। দুপুরের মধ্যে আমরা মিলিয়ে যাই। উনি ঘরে আবার তালা দেন। আর মানিব্যাগে খবরের কাগজের টুকরোটা নিয়ে আরেকটা বছর বেঁচে থাকেন।

"রিফান্ড," রুদ্রবাবু বললেন। একটা ভাঙা, তেতো হাসি। "মরা মানুষকে কী ফেরত দেব? প্রতি বছর আপনারা চান, আর প্রতি বছর আমি না বলি। কারণ আমার কাছে দেওয়ার মতো কিছু নেই। আপনাদের মা-বাবাদের চোখের দিকেও আমি দশ বছরে একবারও তাকাতে পারিনি।"

"কিন্তু আজ," বংশীকাকা আমার দিকে তাকালেন, আর এই প্রথম ওঁর চোখে আমি অন্য কিছু দেখলাম। ভয় না। অন্য কিছু। "আজ তুমি জানলা বন্ধ করেছ, বাবা। দশ বছরে এই প্রথম।"

"আমার মনে পড়ে গিয়েছিল," আমি বললাম। "যে আমি ছিটকিনি তুলেছিলাম।"

"হ্যাঁ। আর সেটাই আসল কথা। ভোগ তখনই ভোগ, যখন সেটা দেওয়া হয়। তুমি নিজে হাতে জানলা বন্ধ করে ওঁকে বুঝিয়ে দিয়েছ, তুমি কারও দেওয়া জিনিস না। তুমি না বলেছ।" উনি টর্চটা আরও জোরে বুকে চেপে ধরলেন। "আর চুরির ভোগ যখন ফিরিয়ে দেওয়া হয়, উত্তর রায় তখন যায় তার কাছে, যে দিয়েছিল। দেনা শোধ নিতে।"

সব মিলে গেল। বড় বাঘটা বন্ধ জানলা দেখে অবাক হয়ে গরগর করছিল। তারপর ঘুরে নুড়ির রাস্তা ধরে নিচে নেমে গিয়েছিল। রাস্তার মাঝখানের সেই বাঁকে, যেখানে সানি প্রতি বছরের মতো বসে ছিল। সেই ছোট্ট চিৎকারটা। রিসেপশনে বেজে চলা ফোন, যেটা ধরার কেউ ছিল না। আর তারপর বাঘটা ফিরে এসে কাচের ওপারে দাঁড়িয়েছিল, রক্তমাখা মুখে, শুধু আমার দিকে তাকিয়ে।

ও আমাকে দেখাতে এসেছিল, যে দেনা শোধ হয়েছে। ঠিক লোকের কাছ থেকে।

"এটাই ন্যায়, বাবা," বংশীকাকা বললেন। "আমি জানি। দশ বছর ধরে জানতাম, একদিন এটাই হবে।" ওঁর গলাটা ভেঙে গেল, আর এতক্ষণ যে বুড়ো মানুষটা একটা শব্দও করে কাঁদেননি, তিনি টর্চটা বুকে চেপে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলেন। "তবু ও আমার সানি ছিল।"

রুদ্রবাবু চৌকাঠে বসে পড়লেন। বন্দুকটা পাশে নামিয়ে রাখলেন। দু'হাতে মুখ ঢাকলেন। "আমি যদি সেদিন কাকার কথাটা একবার শুনতাম..."

১০. বিজয়া

আমি চৌকাঠের ওপর থেকে খাতার পাতাটা তুলে নিলাম।

আজ সকালে আমি জানলার ছিটকিনি তুলতে পেরেছিলাম, তাই জানতাম, চাইলে জিনিস ছুঁতে পারি। পাতাটা হালকা, ভিজে, নরম। আমি সেটা আবার আগের মতো ভাঁজ করলাম। তারপর বংশীকাকার কাছে গিয়ে বসে, ওঁর হাতটা টেনে, পাতাটা ওঁর মুঠোর মধ্যে রেখে, আঙুলগুলো বন্ধ করে দিলাম।

বংশীকাকা চমকে উঠলেন। আমাকে দেখতে পাচ্ছিলেন না, আমি জানি। কিন্তু হাতে কিছু একটা টের পেয়েছিলেন। নিজের মুঠোটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।

"ও বাচ্চা ছিল," আমার পিছন থেকে ইশান আস্তে বলল। "ভয় পাওয়া একটা বাচ্চা।"

রোহন কিছু বলল না। শুধু মাথা নাড়ল।

আর তখনই আমি টের পেলাম, ঠান্ডাটা চলে গেছে।

সারা সকাল একটা অদ্ভুত ঠান্ডা আমার হাড়ের মধ্যে বসে ছিল। ঘুম ভাঙার পর থেকে। হয়তো দশ বছর ধরে। সেটা আর নেই। রোদ ততক্ষণে পাহাড়ের মাথা ছাড়িয়ে উঠে এসেছে, কাচ দিয়ে ঢুকে আমার গায়ে পড়ছে। আর এই প্রথম আমি রোদটা টের পাচ্ছিলাম। গরম। আরামের। ঠিক যেমন শীতের সকালে কলকাতার ছাদে দাঁড়ালে লাগে।

রোহন মুখ তুলল। ওর চোখের জল শুকিয়ে গেছে। ইশান আমার কাঁধে হাত রাখল। ওর হাতটা আর ঠান্ডা না।

রুদ্রবাবু উঠে দাঁড়ালেন। চোখ মুছলেন। তারপর ঘরের ভেতরের দিকে তাকিয়ে, এমন জায়গায়, যেখানে আমরা কেউ দাঁড়িয়ে নেই, বললেন:

"আমি জানি না আপনারা এখনও আছেন কি না। কিন্তু শুনুন। আজ আমি কলকাতা যাব। আপনাদের তিনজনের বাড়িতেই যাব। সব বলব। যা যা হয়েছে, সব। দশ বছর ধরে যেটা বলতে পারিনি।" একটু থেমে বংশীকাকার দিকে তাকালেন। "আর এই ঘরটা আর কোনওদিন কেউ ভাড়া পাবে না। আসছে বছর থেকে নিয়মটা আবার হবে। কাকা যেভাবে বলবেন, ঠিক সেভাবে।"

বংশীকাকা কিছু বললেন না। শুধু হাতজোড় করে কপালে ঠেকালেন।

দরজার বাইরে, নুড়ির রাস্তার মুখে, মোহিনী বসে আছে।

ঠিক সেই জায়গায়, ভোরবেলা যেখানে বসেছিল। কখন ফিরে এসেছে, কেউ দেখিনি। ও আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। ভোরের মতোই শান্ত চোখে। কিন্তু এবার সেই চোখে দুঃখটা আর নেই। এবার ও গুনছিল না। অপেক্ষা করছিল।

রুদ্রবাবু দরজার দিকে তাকালেন। ওঁর চোখ মোহিনীর ওপর দিয়ে চলে গেল, যেন ওখানে শুধু ঘাস আর রোদ ছাড়া কিছু নেই। উনি দেখতে পাচ্ছিলেন না। আমরা বুঝলাম, এখন ওকে শুধু আমরা তিনজনই দেখতে পাচ্ছি।

কিন্তু বংশীকাকা কিছু একটা টের পেলেন। কী, জানি না। হয়তো যে মানুষ সারা জীবন এই পাহাড়ের গল্প বুকে নিয়ে বেঁচেছে, সে এসব বুঝতে পারে। উনি আস্তে আস্তে ঘুরে দরজার দিকে মুখ করলেন, আর রাস্তার মুখের ঠিক সেই জায়গাটার দিকে তাকিয়ে, মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন। ফিসফিস করে বললেন, "মা মোহিনী। ওদের নিয়ে যাও।"

মোহিনী উঠে দাঁড়াল। একবার পিছনে ফিরে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। নিচের জঙ্গলের দিকে না। ডানদিকে, পাহাড়ের দিকে। শিরার মাথার দিকে, যার ওপারে ভুটান, আরও ওপারে বরফের পাহাড়, আরও অনেক ওপারে কৈলাস। কাল দশমী গেছে। মা কাল ওদিকেই ফিরে গেছেন।

মোহিনী রাস্তা দেখায়।

আমরা তিনজন একবার একে অপরের দিকে তাকালাম। তারপর ধুলোর মধ্যে দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে এলাম। রুদ্রবাবুর পাশ দিয়ে, বংশীকাকার পাশ দিয়ে। শিশিরভেজা ঘাসের ওপর পা রাখলাম। পিছনে ফিরে দেখিনি, কিন্তু জানি, কোনও ছাপ পড়ছিল না। আর তাতে এবার একটুও ভয় লাগছিল না।

কয়েক পা এগিয়েছি, হঠাৎ নিচের দিক থেকে একটা আওয়াজ এল। নুড়িপাথরের ওপর ধীর পায়ের আওয়াজ।

নুড়ির রাস্তা বেয়ে একজন মহিলা উঠে আসছেন। আস্তে আস্তে, থেমে থেমে, হাঁপাতে হাঁপাতে। পরনে লাল পাড় সাদা শাড়ি। হাতে একটা ছোট পেতলের প্রদীপ আর একটা গাঁদাফুলের মালা। মাথার চুল ধবধবে সাদা।

আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম।

দশ বছর আগে মায়ের মাথায় একটাও পাকা চুল ছিল না। আমি নিজে মজা করে বলতাম, "তোমাকে আমার দিদি মনে হয়।" এখন মা অনেক রোগা হয়ে গেছে। কাঁধ দুটো একটু ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু হাঁটার ধরনটা একই আছে। প্রদীপটা দু'হাতে ধরার ধরনটাও।

দেখেই বুঝলাম, এই রাস্তায় মা প্রথমবার আসছে না। পা দুটো চেনা রাস্তার মতো করে পাথর বেছে বেছে পড়ছিল। দশ বছর ধরে, প্রতি বছর দশমীর পরের সকালে, মা নিশ্চয়ই এখানে আসে। কাচঘরের দরজায় প্রদীপ জ্বালাতে, মালা রাখতে। আর রুদ্রবাবু প্রতি বছর দূর থেকে দেখেন, কাছে যেতে পারেন না। এখন বুঝলাম, উনি দশ বছরে কার চোখের দিকে তাকাতে পারেননি।

"মা," আমি বললাম।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে মা থেমে গেল। রাস্তার মাঝখানে। যেন কেউ পিছন থেকে নাম ধরে ডেকেছে।

আমি দৌড়ে নেমে গেলাম। মায়ের সামনে দাঁড়ালাম। মা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু আমাকে না। আমার ওপারে, পাহাড়ের দিকে। আমি নিচু হয়ে মায়ের পায়ে হাত দিলাম। দশ বছর আগে দশমীর রাতে ফোনে প্রণাম করেছিলাম, কথা দিয়েছিলাম, ফিরে এসে সামনে থেকে করব। আজ করলাম।

মা কেঁপে উঠল। পায়ের দিকে তাকাল। প্রদীপের শিখাটা একটু দুলে উঠল, যদিও কোনও হাওয়া ছিল না। তারপর মা খুব আস্তে, প্রায় নিঃশ্বাসের মতো করে বলল, "নীলু?"

আমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর দেখলাম, মায়ের মুখে একটা হাসি ফুটে উঠছে। আস্তে আস্তে, যেন অনেকদিন ব্যবহার না হওয়া কোনও জিনিস আবার মনে পড়ছে। দশ বছরে এই প্রথম। আমি জানি, কারণ মায়ের মুখটা আমি চিনি।

"শুভ বিজয়া, নীলু," মা বলল।

ঠিক এই কথাগুলোই মা শেষবার বলেছিল। দশ বছর আগে, ফোনে।

আমার হাতের লাল সুতোটা রোদে চকচক করছিল। আমি মায়ের হাতটা একবার ছুঁয়ে দিলাম। তারপর উঠে দাঁড়ালাম।

ওপর থেকে রুদ্রবাবু নেমে আসছিলেন। মায়ের কাছে এসে দাঁড়ালেন। আর এই প্রথম, দশ বছরে এই প্রথম, মায়ের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকালেন।

"মাসিমা," উনি বললেন। "আপনাকে কিছু বলার আছে।"

আমি আর দাঁড়ালাম না। ইশান আর রোহন ওপরে অপেক্ষা করছিল। মোহিনীও। আমি ওদের কাছে উঠে গেলাম, আর আমরা চারজন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠতে শুরু করলাম। শিরার দিকে। রোদের দিকে।

শিরার দিকে, রোদের দিকে

খানিকটা ওঠার পর ইশান হঠাৎ বলল, "যাক, মাসিমা অন্তত এবার সত্যিটা জানবে। রিফান্ড বলতে ওটাই।"

"আর টাকাটা?" রোহন বলল।

ইশান একটু ভাবল। "ব্যাটা ওটা কিন্তু শেষ অবধি দিল না।"

রোহন হেসে ফেলল। দশ বছরে প্রথমবার। তারপর আমিও।

নিচে, নদীর ওপারের গ্রাম থেকে কেউ একটা শাঁখ বাজাল। লম্বা, পরিষ্কার একটা আওয়াজ, পাহাড়ে পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল।

আমরা হাসতে হাসতে মোহিনীর পিছন পিছন শিরার মাথার দিকে উঠে গেলাম। রোদের মধ্যে দিয়ে। আর এবার, দশ বছরে এই প্রথম, ভোরটা সত্যিই শেষ হল।

——

Leave a comment

No account needed. Leave the name blank and you'll get a random one.

0/2000
By email

Get the next one in your inbox.

Engineering post-mortems, mathematics, and short fiction, in English and Bengali. Infrequent by design: an email only when there is something new worth reading, never on a schedule. One click to leave, any time.

Double opt-in: you'll get one email to confirm, and nothing else until you do.