All posts
BengaliShort StoryComedy

অলখ প্রহর

চাটুজ্জেদের রকে গজেনদার একটাই অটল বিশ্বাস ছিল — পৃথিবীতে এমন কোনো লোক জন্মায়নি, যাকে গজেনদা চেনে না।

প্রধানমন্ত্রী? "আরে, ছোটবেলায় এক সাইকেলে চেপে স্কুলে যেতাম।" টেস্ট ক্রিকেট খেলিয়ে অমুক? "ওর প্রথম ব্যাট আমার দেওয়া।" চাঁদে যে লোকটা প্রথম নেমেছিল? এখানে গজেনদা একটু থামতেন, চায়ের ভাঁড়ে শেষ চুমুক দিতেন, তারপর বলতেন — "ও আর এমন কী।"

আমরা, মানে রকের চিরস্থায়ী বেকার বাহিনী — আমি, হাবুল, আর ভোলা — কোনোদিন বিশ্বাস করিনি, আবার কোনোদিন অবিশ্বাসও করিনি। গজেনদাকে অবিশ্বাস করা আর কেলোর চায়ে চিনি কম দেওয়া — পাড়ায় দুটোই অসম্ভব বলে ধরা হত। কেলোর চায়ে চিনি থাকত বেশি, আর গজেনদার কথায় — "চিনি" আরও বেশি।

গোল বাধল সরস্বতী পুজোর সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা নিয়ে।

ক্লাবের সম্পাদক বিশুদা মাথায় হাত দিয়ে বসে। "প্রধান অতিথি নেই। গতবার পাশের পাড়া কাউন্সিলরকে এনেছিল, এবার আমাদের কাউন্সিলরের থেকে বড় কিছু একটা চাই, নইলে মান থাকে না।"

হাবুল বলল, "কবি নীহাররঞ্জন সমাদ্দারকে আনলে কেমন হয়?"

রকসুদ্ধ লোক হেসে উঠল। কারণ নীহাররঞ্জন সমাদ্দার পঁচিশ বছরে একবারও জনসমক্ষে আসেননি। পদ্মশ্রী নিতে যাননি, লোক পাঠিয়েছিলেন। তাঁর সেই অমর পঙ্‌ক্তি — "জানালার ধারে বসে গুনি অলখ প্রহর" — তখন মাধ্যমিকের সিলেবাসে। "অলখ প্রহর" কথাটার মানে নিয়ে তিনখানা গবেষণাপত্র, একটা গোটা সেমিনার, আর হাবুলের কাকার পাকা চুল — সব খরচ হয়ে গেছে। কেউ জানে না "অলখ প্রহর" বস্তুটি ঠিক কী। কেউ স্বীকারও করে না যে জানে না।

"নীহার?" — গজেনদা চায়ের ভাঁড় নামিয়ে রাখলেন।

এক মুহূর্তের জন্য — শুধু এক মুহূর্ত — গজেনদার মুখে এমন একটা ভাব খেলে গেল, যেটা ঠিক বড়াই নয়। কীসের যেন ছায়া। আমি তখন বুঝিনি। কেউ বোঝেনি।

"নীহার তো আমার একেবারে হাতের লোক," গজেনদা গলা পরিষ্কার করলেন। "একটা চিঠি লিখলেই চলে আসবে। আমি আর চিনি না!"

এটাই ছিল গজেনদার মহাবাক্য, ব্রহ্মাস্ত্র — "আমি আর চিনি না!" এর পরে তর্ক করা মানে দেশলাই দিয়ে রোদ মাপতে যাওয়া।

বিশুদা আনন্দে গজেনদার দুটো হাত চেপে ধরলেন। ক্লাবের খাতায় বড় বড় করে লেখা হল: প্রধান অতিথি — কবি নীহাররঞ্জন সমাদ্দার (গজেন্দ্রবাবুর ব্যবস্থাপনায়)।

আর ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে গজেনদার মুখের হাসিটা একটু একটু করে শুকোতে শুরু করল।

প্রথম দিন গজেনদা বললেন, "চিঠি লিখে দিয়েছি। ডাকে গেছে।"

তিন দিন পর: "জবাব এসেছে। উনি শান্তিনিকেতনে। ফিরলেই আসবেন।"

পাঁচ দিন পর, একটু ঘেমে: "একটু শরীর খারাপ। বাতের ব্যথা। কবিদের ওসব থাকে।"

রকের তিনটে মিথ্যে। চতুর্থটার জায়গা ছিল না — কারণ চতুর্থ দিনেই পুজো।

পুজোর সন্ধেবেলা মণ্ডপ থিকথিক করছে। সামনের সারিতে রিজার্ভ চেয়ারে সাদা চাদর পাতা, তার উপর গোলাপ। মাইকে বিশুদা বারবার বলছেন, "একটু পরেই আসছেন আমাদের সকলের প্রিয় কবি—" আর প্রতিবার "একটু পরে"-র দৈর্ঘ্য বেড়ে যাচ্ছে। গজেনদা পিছনে একটা থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে, মুখ চুনের মতো সাদা, ঠিক যেন নিজেই একটা কবিতার লাইন — অলখ প্রহর গুনছেন।

আমি ফিসফিস করে বললাম, "গজেনদা, এবার?"

গজেনদা আমার দিকে তাকালেন না। শুধু বললেন, "আমি সত্যিই একটা চিঠি লিখেছিলাম রে। কাল রাতে। আর কোনো উপায় ছিল না।" তারপর, প্রায় নিজের মনেই — "জানি না চিনতে পারবে কিনা।"

ঠিক তখনই গেটের কাছে একটা গাড়ি থামল।

ভিড় দু-ভাগ হয়ে গেল। নামলেন এক রোগা, ফর্সা, পাঞ্জাবি-পরা বৃদ্ধ — চোখে মোটা চশমা, হাতে একটা পুরনো খাম। বিশুদা চিনতে পেরে প্রায় মূর্ছা যান আর কি। সত্যিই তিনি। পঁচিশ বছরের আড়াল ভেঙে কবি নীহাররঞ্জন সমাদ্দার এসে দাঁড়িয়েছেন আমাদের ছাপোষা পাড়ার মণ্ডপে।

সমস্ত পাড়া রুদ্ধশ্বাসে দেখল — কবি চারদিকে চোখ বোলালেন। অতিথিদের পেরিয়ে, বিশুদাকে পেরিয়ে, রিজার্ভ চেয়ার পেরিয়ে — সোজা হেঁটে গেলেন থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা গজেনদার দিকে।

তারপর দুই হাত বাড়িয়ে গজেনদাকে জড়িয়ে ধরলেন।

"গজেন! তবে তুমি বেঁচে আছ!"

মণ্ডপে যে শব্দটা উঠল, সেটাকে ঠিক হাততালি বলা যায় না — ওটা ছিল বিশ্বাসভঙ্গের আওয়াজ, আস্ত একটা পাড়ার পঁচিশ বছরের সন্দেহ একসঙ্গে ভেঙে পড়ার শব্দ। গজেনদা সত্যি কথা বলছিলেন। গজেনদা সবসময় সত্যি কথা বলছিলেন।

কবি তখন আবেগে কাঁপছেন। "জানেন," তিনি সকলের দিকে ফিরে বললেন, "এই লোকটার কাছে আমি যা ঋণী, তা শোধ হওয়ার নয়। বহু বছর আগে, বটতলার এক ছাপাখানায় ও প্রুফ দেখত—"

আমি দেখলাম গজেনদার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

"—আমার প্রথম বইয়ের পাণ্ডুলিপি। আমি লিখেছিলাম, 'জানালার ধারে বসে গুনি অলস প্রহর।' অলস। মানে অলস সময়, কুঁড়েমির বিকেল। নিতান্ত সাদামাটা লাইন।" কবি একটু থামলেন। "কিন্তু ছাপা বইয়ে দেখি লেখা — 'অলখ প্রহর।' গজেন প্রুফ দেখার সময় 'স'-টাকে 'খ' করে বসিয়েছিল।"

সারা মণ্ডপ নিস্তব্ধ।

"সেই একটা ভুলের উপর আমার গোটা জীবন দাঁড়িয়ে। ছত্রিশ বছর ধরে পণ্ডিতরা 'অলখ প্রহর'-এর মানে খুঁজছেন। অলস প্রহরের কোনো মানে হয় না, কিন্তু অলখ প্রহরের — ওরে বাবা — কত গভীর মানে!" কবি গজেনদার পিঠে হাত রাখলেন, গলা নামিয়ে, প্রায় ভক্তের স্বরে — "ভাগ্যিস তুমি বানানটা জানতে না, গজেন। নইলে আমি আজও বটতলায় অলস প্রহর গুনতাম।"

কিন্তু সামনের সারির লোকজন ততক্ষণে শুধু একটা জিনিসই শুনেছে — কবি নীহাররঞ্জন সমাদ্দার গজেনদাকে চেনেন। ব্যক্তিগতভাবে। পুরোনো বন্ধু। "ছাপাখানা," "প্রুফ," "ভুল" — এসব খুচরো শব্দ ভিড়ের আনন্দধ্বনিতে কোথায় তলিয়ে গেল।

গজেনদা ধীরে ধীরে থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন। মুখে আবার সেই চিরচেনা প্রসন্নতা ফিরে আসছে, সূর্যোদয়ের মতো। তিনি একবার আমাদের দিকে তাকালেন। তারপর ভিড়ের দিকে দু-হাত তুলে, যেন গোটা ব্যাপারটা তিনিই আগাগোড়া পরিচালনা করেছেন, বললেন —

"বলেছিলাম তো। আমি আর চিনি না!"


সেদিন রাতে কেলোর দোকানে চা খেতে খেতে হাবুল বলেছিল, "তাহলে গজেনদা সারাজীবন সত্যি কথা বলে আসছিল?"

ভোলা অনেকক্ষণ ভেবে বলল, "না। সারাজীবন মিথ্যে বলে এসেছে। শুধু আজকেরটা ভুল করে সত্যি হয়ে গেছে।"

আর আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। কবির গোটা জীবন দাঁড়িয়ে আছে একটা ভুল বানানের উপর। আর গজেনদার গোটা সম্মান দাঁড়িয়ে গেল একটা ভুল-করে-সত্যি হওয়া মিথ্যের উপর।

পাড়ায় আজও কেউ "অলখ প্রহর"-এর মানে জানে না।

আর গজেনদাকে আজও কেউ অবিশ্বাস করার সাহস পায় না।

Leave a comment

No account needed. Leave the name blank and you'll get a random one.

0/2000