ইলিশ সীমান্ত
উনিশশো আটাত্তরের কলকাতা — একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক, অথচ দুই বাংলার প্রতিটি পাতে সত্য গল্প (সমস্ত চরিত্র, ক্লাব ও ম্যাচ কাল্পনিক। মিল খুঁজে পেলে দায় আপনার রক্তের, লেখকের নয়।)
এক ॥ দুই নদীর শহর
কলকাতা শহরটা ভূগোল বইয়ে এক, কিন্তু আসলে দুই। এবং সে-বিভাজন উত্তর-দক্ষিণে নয়, হিন্দু-মুসলমানেও নয় — সে-বিভাজন আরও গভীর, আরও প্রাচীন, আরও অমীমাংসিত।
ঘটি আর বাঙাল।
সীমান্তটা কোথায়, তা কোনো ম্যাপে নেই, অথচ শহরের প্রতিটি রান্নাঘর জানে। এপারে চিংড়ির মালাইকারি, নারকোলের মিষ্টত্ব, "খেয়েছ?"-র টান। ওপারে ইলিশের ঝাল, শুঁটকির দাপট, "খাইছ?"-র ঝাঁঝ। এপার বলে ওরা উদ্বাস্তু, ওপার বলে এরা ভেতো। এপার রাঁধে চিনি দিয়ে, ওপার কাঁচালঙ্কা দিয়ে, এবং দুই পক্ষই নিশ্চিত — বাংলা রান্নার স্বর্গের চাবি তাদেরই সিন্দুকে।
আর বছরে দু'বার এই ঠান্ডা লড়াই গরম হয়ে নামে গড়ের মাঠে — যেদিন মুখোমুখি হয় ভাগীরথী ক্লাব আর পদ্মা সমিতি।
ভাগীরথী ক্লাব — সবুজ-মেরুন, শতাব্দীপ্রাচীন, ঘটিদের গর্ব। পদ্মা সমিতি — লাল-হলুদ, ওপার-বাংলার আবেগে গড়া, বাঙালদের অস্তিত্ব। এই দুই ক্লাবের ম্যাচের দিন শহরে অফিস প্রায় ফাঁকা, আদালতে জামিন মুলতুবি, আর হাসপাতালে ডাক্তাররা রোগীর নাড়ি দেখার ফাঁকে ট্রানজিস্টরের নব ঘোরান। ম্যাচ শেষে এক পাড়ায় ইলিশের দর চড়ে, অন্য পাড়ায় চিংড়ির — কারণ জয়ের ভোজেরও জাত আছে।
উনিশশো আটাত্তরের সেই বর্ষায় লিগ জমেছিল সাংঘাতিক। দুই চিরশত্রু পয়েন্ট-তালিকায় গলা-গলা; মরসুমের ফয়সালা হবে শেষ ডার্বিতে। শহর ফুটছিল।
আর ঠিক সেই ফুটন্ত কড়াইয়ে, হরিসাধন ঘটক নামালেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প —
একটি ঘটি-বাঙাল বিবাহ।
দুই ॥ ঘটকের গম্ভীরা
হরিসাধনবাবুর পদবিই ঘটক, পেশাও তাই — এমন মিল ভাগ্যে থাকলে মানুষ পেশাকে ধর্ম বলে ভাবতে শুরু করে। তেত্রিশ বছরের কেরিয়ারে তিনি চারশো সাতাত্তরটা বিয়ে দিয়েছেন, এবং নিজের হিসেবে তার মধ্যে "অঘটন" মাত্র এগারোটা। সাফল্যের এই হার নিয়ে তিনি বলতেন, "ব্যাঙ্কের সুদের চেয়ে ভালো, আর সরকারি প্রকল্পের চেয়ে তো কথাই নেই।"
কিন্তু চারশো সাতাত্তরটার মধ্যে একটাও ঘটি-বাঙাল বিয়ে ছিল না। ও-জিনিসে হাত দিতে ঘটকমহলে সাহস লাগে; হরিসাধনবাবুর ভাষায়, "ও হল ঘটকালির এভারেস্ট। ওঠার রাস্তায় হাড়গোড় ছড়ানো।"
তা এভারেস্টে ওঠার নেশা যাদের চাপে, যুক্তি দিয়ে তাদের নামানো যায় না। পাত্র তাঁর হাতেই ছিল — বাগবাজারের মুখুজ্জেবাড়ির ছেলে অপূর্ব, ব্যাঙ্কে সদ্য অফিসার, শান্ত, সুদর্শন, এবং বিবাহযোগ্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ — নিজের মতামত প্রকাশ্যে বলে না। পাত্রীও হাতে ছিল — বিজয়গড় কলোনির ভৌমিকবাড়ির মেয়ে কৃষ্ণকলি, বি.এ.-তে ফার্স্ট ক্লাস, স্কুলে পড়ায়, এবং চোখদুটিতে এমন একটা ধার আছে যে ছবি দেখেই তিন পাত্রপক্ষ "ভেবে জানাব" বলে আর জানায়নি।
দুই পরিবারই আলাদা করে হরিসাধনের পুরনো মক্কেল। সমস্যা একটাই — মাঝখানের সীমান্ত।
পাত্রের বাবা নগেন মুখুজ্জে — বাগবাজারের বনেদি, ভাগীরথী ক্লাবের আজীবন সদস্য, যাঁর বৈঠকখানায় ক্লাবের পতাকার নিচে ঠাকুরদার তৈলচিত্র, এবং তৈলচিত্রের নিচে লেখা "সত্যং শিবং সবুজ-মেরুন।" বাঙাল সম্পর্কে তাঁর মত ছিল সংক্ষিপ্ত: "ওরা আসলে ভালো, তবে বড্ড... আছে।"
পাত্রীর ঠাকুরদা রাখালরাজ ভৌমিক — বিজয়গড় কলোনির প্রতিষ্ঠাতা-পুরুষদের একজন, পদ্মা সমিতির গোঁড়া সমর্থক, যাঁর মুখে ময়মনসিংহের ভিটের গল্প শুনে তিন প্রজন্ম চোখের জল ফেলেছে। ঘটি সম্পর্কে তাঁর মত আরও সংক্ষিপ্ত: "যারা চিংড়িরে মাছ কয়, তাগো লগে আবার আলোচনা কীসের?"
এই দুই মহাদেশের মাঝখানে সেতু বাঁধতে নামলেন হরিসাধন ঘটক। এবং প্রথম দিনই বুঝলেন, সেতুর নকশায় সবচেয়ে জরুরি জিনিসটা ইঞ্জিনিয়ারিং নয় — মেনু।
মুখুজ্জেবাড়িতে পাত্রীপক্ষের প্রথম নিমন্ত্রণে ভাত-ডালের পাশে নামল চিংড়ির মালাইকারি — নারকোল দুধে ডোবানো, ঘন, মিষ্টি। রাখালরাজ থালার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন, যেন শোকপ্রস্তাব পাঠ হচ্ছে। তারপর একটা চিংড়ি তুলে বহুক্ষণ পরীক্ষা করে বললেন, "পোকাটা রানছেন ভালো।"
পাল্টা নিমন্ত্রণে বিজয়গড়ে ভাতের পাশে নামল শুঁটকির তরকারি — যার সুবাস মুখুজ্জেবাড়ির মেজকর্তা দরজা থেকেই টের পেয়ে "আমার একটু গ্যাসের ব্যামো" বলে বৈঠকখানায় থেকে গেলেন। নগেন মুখুজ্জে অবশ্য দাঁতে দাঁত চেপে খেলেন — বেয়াইবাড়ির যুদ্ধে পিছু হটা মুখুজ্জেদের রক্তে নেই। খেয়ে বললেন, "চমৎকার। কীসের... মানে, এটি কী ছিল?"
"চ্যাপা," রাখালরাজ তৃপ্ত গলায় বললেন, "ঘেরাণেই অর্ধেক খাওন। আপনেগো ওই দুধে-ডোবানো পোকায় ঘেরাণ কই?"
দুই কর্তার এই মৎস্য-কূটনীতির ফাঁকে ফাঁকেই অবশ্য আসল কাজটা এগোচ্ছিল। পাত্র-পাত্রী দেখাদেখি হল, পছন্দও হল — সে-গল্প একটু পরে। মধ্যবর্তী প্রজন্ম — অপূর্বর মা আর কলির বাবা সুধাংশু — দুই তরফেই শান্তিকামী; তাঁদের যুক্তি ছিল সহজ: ছেলেমেয়ে সুখী হলে ইলিশ-চিংড়ি পাতের ব্যাপার, প্রাণের ব্যাপার কেন হবে?
প্রশ্নটা আন্তরিক ছিল। উত্তরটা আটাত্তরের কলকাতা অচিরেই দেবে।
তিন ॥ কফি হাউসের টেবিল
পাত্র-পাত্রীর আলাপ করানো হয়েছিল কফি হাউসে — নিরপেক্ষ ভূমি, দুই বাংলারই দখলে।
প্রথম দশ মিনিট গেল আবহাওয়া, চাকরি আর "আপনি কী পড়তে ভালোবাসেন" পর্বে। এগারো মিনিটের মাথায় কলি সরাসরি জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, আপনি কি সত্যিই এ-বিয়েতে রাজি, না বাড়ির চাপে এসেছেন?"
অপূর্ব কফির কাপে চোখ রেখে বলল, "বাড়ির চাপে এসেছিলাম। এই এগারো মিনিটে রাজি হয়ে গেছি।"
কলি হাসি চাপল। ছেলেটা সরল, কিন্তু বোকা নয় — এ-কম্বিনেশন দুর্লভ।
আলাপ জমল। সাহিত্য মিলল (দু'জনেই বিভূতিভূষণ), গান মিলল (দু'জনেই হেমন্ত), সিনেমা মিলল। শুধু একটা জায়গায় এসে দু'জনেই সাবধানে ব্রেক কষল — খেলা।
"আপনি... খেলা দেখেন?" অপূর্ব জিজ্ঞেস করেছিল, গলায় মাপা নিরাসক্তি।
"ওই... রেডিওতে শুনি মাঝে মাঝে," কলি বলেছিল, জানলার বাইরে তাকিয়ে। "আপনি?"
"ওই আর কি। ভদ্রতা রাখার মতো।"
দু'জনেই মিথ্যে বলল। এবং দু'জনের মিথ্যেই ছিল একই ওজনের, শুধু উল্টো দিকে ফেরানো।
সত্যিটা এই: বাগবাজারের মুখুজ্জেবাড়ির ছেলে অপূর্ব — ভাগীরথী ক্লাবের আজীবন সদস্যের একমাত্র পুত্র — আসলে পদ্মা সমিতির অন্ধ ভক্ত। পাপটা ঢুকেছিল বারো বছর বয়সে, মামার সঙ্গে মাঠে গিয়ে; সেদিন পদ্মার দশ নম্বর জার্সির এক শিল্পী এমন একটা গোল করেছিলেন যে বালক অপূর্বর হৃদয় মালিকানা বদলে ফেলে। সেই থেকে ষোলো বছর সে ডাবল জীবন কাটাচ্ছে — বাড়িতে সবুজ-মেরুন মুখোশ, বালিশের নিচে লাল-হলুদ হৃদয়। বাবার সঙ্গে গ্যালারিতে বসে নিজের ক্লাবের বিরুদ্ধে হাততালি দেওয়ার যন্ত্রণা কী জিনিস, তা একমাত্র সে-ই জানত।
আর বিজয়গড় কলোনির মেয়ে কৃষ্ণকলি — রাখালরাজ ভৌমিকের নয়নের মণি — ছিল ভাগীরথী ক্লাবের গোপন সমর্থক। তার অপরাধের বয়সও বারো; স্কুল থেকে ফেরার পথে পাড়ার ইলেকট্রিকের দোকানের রেডিওয় সে শুনেছিল ভাগীরথীর লেফট উইঙ্গারের একক দৌড়ের ধারাবিবরণী — "বাঁ পায়ে নাচালেন, ডান পায়ে কাটালেন, এ যেন ফুটবল নয়, উচ্চাঙ্গ সংগীত!" — ব্যস। শিল্পের কাছে সীমান্ত হেরে গিয়েছিল। ঠাকুরদার বাড়িতে এ-কথা ফাঁস হওয়া আর কলোনির মাটিতে বিষবৃক্ষ পোঁতা সমান, তাই ষোলো বছর ধরে কলিও পুষছে তার নিষিদ্ধ প্রেম — ঠাকুরদার পাশে বসে পদ্মার জয়ে উলু দেয়, আর ভেতরে ভেতরে হিসেব রাখে ভাগীরথীর পয়েন্টের।
দুটি পরিবার ভাবছিল তারা ঘটি-বাঙালের সেতু বাঁধছে। তারা জানত না, পাত্র-পাত্রী নিজেরাই এক-একটা চোরাচালান — সীমান্তের এপারে ওপারের মাল।
বিয়ের সম্বন্ধ পাকা হয়ে গেল। এবং তারপরেই, একে একে, খুলতে লাগল নিয়তির প্যাঁচ।
চার ॥ পঞ্জিকা বনাম ফিক্সচার
দিন স্থির করতে বসলেন দুই বাড়ির কর্তারা, মাঝখানে পুরুতমশাই, হাতে পঞ্জিকা।
অগ্রহায়ণে লগ্ন তিনটে। প্রথমটায় মুখুজ্জেদের আপত্তি — ওদিন ওঁদের গৃহদেবতার বিশেষ তিথি। দ্বিতীয়টায় ভৌমিকদের আপত্তি — রাখালরাজের প্রয়াত স্ত্রীর মৃত্যুদিন। রইল তৃতীয়টা — অগ্রহায়ণের বারো তারিখ, রবিবার। পঞ্জিকামতে লগ্ন সন্ধে ৬টা ৪৭ থেকে রাত ৮টা ৯।
দুই কর্তা ক্যালেন্ডার দেখলেন। রবিবার — ভালো, নেমন্তন্নের সুবিধে। ডিসেম্বরের গোড়া — ভালো, ইলিশও নয়, চিংড়িরও দরকার নেই, ভেটকির মরসুম; ভেটকি এ-যুদ্ধের সুইজারল্যান্ড। কারো কিছু মনে পড়ল না। ফুটবল-লিগ তো কবেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।
দিন পাকা হল। কার্ড ছাপা হল — "শ্রীশ্রীপ্রজাপতয়ে নমঃ" — চারশো খানা।
কার্ড বিলি অর্ধেক হয়েছে, এমন সময় খবরের কাগজের খেলার পাতায় বেরোল সেই ঘোষণা, যেটা দুই বাড়িতে একই সকালে, একই ভঙ্গিতে, চায়ের কাপ হাতে পাঠ করা হল —
"অতিবৃষ্টিতে পরিত্যক্ত লিগের ফয়সালা-ম্যাচ ভাগীরথী ক্লাব বনাম পদ্মা সমিতি পুনরায় অনুষ্ঠিত হইবে আগামী ১২ অগ্রহায়ণ, রবিবার, বিকাল ৪টায়। উক্ত ম্যাচেই নির্ধারিত হইবে এ-মরসুমের চ্যাম্পিয়ন।"
শ্রাবণের সেই ভেস্তে-যাওয়া ডার্বি — যেটার কথা সবাই ভুলেই গিয়েছিল — ফেডারেশন সেটা ফেলল ঠিক বিয়ের দিনে। বিকেল চারটেয় ম্যাচ; আশি মিনিটের খেলা, ইনজুরি টাইম, মাঠ থেকে ফেরার ভিড় — আর সন্ধে ৬টা ৪৭-এ লগ্ন।
নগেন মুখুজ্জে প্রথমে দিন বদলাতে চাইলেন। পুরুত জানালেন, পরের শুভলগ্ন মাঘের শেষে — মাঝে গোটা পৌষ মলমাস। রাখালরাজ হল বদলাতে চাইলেন — যদি মাঠের কাছাকাছি কোথাও... সুধাংশু আঁতকে উঠলেন, "বাবা, বিয়েবাড়ি কি গ্যালারিতে হবে?" কার্ড ফেরানোর প্রস্তাবে দুই গিন্নি একযোগে জানালেন, চারশো কার্ডের পর দিন বদলালে সমাজে মুখ থাকবে না; সমাজ লগ্ন মানে, লিগ মানে না।
অতএব সিদ্ধান্ত হল — যা আছে কপালে। বিয়েও হবে, ম্যাচও হবে, একই রবিবারে। শুধু দুই বাড়িতে একই নির্দেশ জারি হল, হুবহু এক ভাষায়: "বিয়েবাড়িতে খেলার নামটিও যেন না শুনি। একটা ট্রানজিস্টর দেখলে গঙ্গায় ফেলব।"
নির্দেশটা দু'বাড়ির সবাই গম্ভীর মুখে মেনে নিল। এবং সেই মুহূর্ত থেকে দু'বাড়ির প্রতিটি সদস্য নিজের নিজের মতো করে হিসেব কষতে লাগল — পাঞ্জাবির কোন পকেটে ছোট ট্রানজিস্টরটা ধরে, আর ইয়ারফোনের তারটা উত্তরীয়ের নিচ দিয়ে কোন পথে গেলে চোখে পড়ে না।
পাঁচ ॥ গড়াপেটার গুজব
বিয়ের হপ্তা দুয়েক আগে পাড়ায় পাড়ায় একটা গুজব চারিয়ে গেল, যেমন যায় — কেউ জানে না কোত্থেকে এল, অথচ সবাই জানে।
গুজবটা: ফয়সালা-ম্যাচে গড়াপেটা হচ্ছে।
সূত্র? বাগবাজারের রকের নিতাইয়ের ভায়রাভাই নাকি নিজের কানে শুনেছে — হরিসাধন ঘটক মোড়ের চায়ের দোকানের ফোনে চাপা গলায় বলছেন, "ওদিকের খবর পাকা। বারো তারিখেই ফয়সালা। দর এখন তিন-এ এক... হ্যাঁ হ্যাঁ, দু'পক্ষের ভেতরেই আমার লোক আছে... শেষ মুহূর্তে ভেস্তে যাওয়ার চান্স? আছে, তবে কম। আমি ভেতর থেকে সামলাচ্ছি।"
বিজয়গড়েও একই খবর, শুধু সাক্ষী আলাদা — কলোনির সাধন মাস্টার নিজের কানে শুনেছেন ঘটকমশাই বলছেন, "পাকা খেলোয়াড় দু'জনই... না না, কেউ বেঁকে বসবে না, বসলে আমার তিরিশ বছরের সুনাম... আরে ফাইনাল সেরেমনির আগে টাকা ছাড়বেন না।"
দুই পাড়া দুই সিদ্ধান্তে এল, এবং দুটোই লৌহকঠিন। বাগবাজার নিশ্চিত: বাঙালরা রেফারি কিনেছে। বিজয়গড় নিশ্চিত: ঘটিরা পদ্মার স্টপারকে কিনেছে। রাখালরাজ ভৌমিক ক্লাব-তাঁবুতে চিঠি পাঠালেন — "সতর্ক থাকিবেন, শত্রু ভিতরে।" নগেন মুখুজ্জেও পাঠালেন — ভাষা আলাদা, মর্ম এক।
কেউ একবারও ভাবল না, ফুটবল-গড়াপেটার আলোচনায় "ফাইনাল সেরেমনি" শব্দটা ঠিক খাপ খায় কি না।
আসল ব্যাপারটা ছিল অনেক সরল, এবং সেই কারণেই কারো মাথায় ঢোকেনি। হরিসাধন ঘটকের এভারেস্ট-অভিযানের খবর ততদিনে ঘটকমহল ছাড়িয়ে পাড়ার বাজি-মহলে পৌঁছে গিয়েছিল। ঘটি-বাঙাল বিয়ে! হবে কি হবে না! এমন লোভনীয় অনিশ্চয়তা পেলে বাজিকরের রক্ত গরম হয় — মোড়ে মোড়ে বই খুলে গেল। বিয়ে ভাঙবে কি না, ভাঙলে কোন পক্ষ ভাঙবে, আশীর্বাদ অবধি গড়াবে কি না, ছাদনাতলা অবধি — প্রতিটি ধাপের আলাদা দর।
আর এ-বাজারে সবচেয়ে দামি "ইনসাইড ইনফরমেশন" কার হাতে? যিনি দুই বাড়িরই অন্দরমহলে অবাধ, যিনি জানেন কোন কর্তা কখন নরম, কোন গিন্নি কখন গরম?
হরিসাধন ঘটক তেত্রিশ বছর মধ্যস্থতা করে যা রোজগার করেননি, এই এক বিয়ের বাজারে "টিপস" বেচে তার তিনগুণ তুলছিলেন। তাঁর যুক্তিতে এতে অন্যায় ছিল না: "আমি তো বিয়েটা হওয়ানোর জন্যেই প্রাণপাত করছি। নিজের পরিশ্রমের ওপর বাজি ধরা কি পাপ? লোকে তো নিজের জমিতেই চাষ করে।"
শুধু ফোনে কথাগুলো একটু ঢেকেঢুকে বলতে হত — বাজির আইনি দিকটা বরাবরই ছায়াঘেরা। সেই ঢাকাঢুকিই কানে কানে পাক খেয়ে হয়ে দাঁড়াল ম্যাচ-গড়াপেটার মহাগুজব, যার ফলে বিয়ের সপ্তাহে দুই ক্লাবের সমর্থকরা এমন সন্দিগ্ধ, খ্যাপা মেজাজে পৌঁছল যে ফেডারেশন মাঠে বাড়তি পুলিশ চাইল।
ঘটকালি জিনিসটাই আসলে গড়াপেটা — দুই অনিচ্ছুক পক্ষকে ভেতর থেকে ম্যানেজ করে একটা নির্ধারিত ফল ঘটানো। তফাত এই যে, এ-খেলায় গড়াপেটাটাই বৈধ, বরং না হলেই কেলেঙ্কারি।
ছয় ॥ কুটুম্ব পরিতোষ
গুজবের আগুনে ঘি পড়ল আর এক জায়গা থেকে।
সে-মরসুমে ময়দানের সবচেয়ে চর্চিত নাম — পরিতোষ বাড়ুজ্জে। পদ্মা সমিতির নতুন স্ট্রাইকার, বাইশ বছর বয়স, হাওড়ার ছেলে, এবং গোলের সামনে এমন ঠান্ডা মাথা যে কাগজ লিখেছিল, "বাড়ুজ্জের পায়ে বল পড়িলে গোলরক্ষকের প্রার্থনা ব্যতীত উপায় থাকে না।"
বিয়ের তত্ত্ব-তালাশের মধ্যেই একদিন রাখালরাজ ঘোষণা করলেন, "পরিতোষ আমাগো কুটুম। ওর ঠাকুমার বাপের বাড়ি আছিল আমাগো ময়মনসিংহের পাশের গেরামে। সম্পর্কে আমার মামাতো ভইনের নাতি হয়। বিয়াতে নিমন্ত্রণ যাইব।"
খবরটা বাগবাজারে পৌঁছনো মাত্র নগেন মুখুজ্জে বৈঠকখানায় সভা ডাকলেন। ঘণ্টাখানেক বংশলতিকা ঘাঁটাঘাঁটির পর মুখুজ্জেপক্ষ পাল্টা ঘোষণা করল: "পরিতোষ বাড়ুজ্জে আমাদের কুটুম। ওর মায়ের মামাবাড়ি হাওড়ার যে-বাড়িতে, সে-বাড়ির মেজো মেয়ের বিয়ে হয়েছিল আমাদের সেজো পিসেমশাইয়ের ভাগ্নের সঙ্গে। অর্থাৎ সম্পর্কে ও আমার... " — সম্পর্কটা ঠিক কী দাঁড়াল তা সভার কেউ পুনরুৎপাদন করতে পারেনি, তবে সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত: কুটুম। নিমন্ত্রণ যাবে, এবং ভৌমিকদের কার্ডের আগে পৌঁছবে।
দুই বাড়ি থেকে দু'খানা কার্ড গেল পদ্মা সমিতির তাঁবুতে, একই সপ্তাহে, একই নামে। দুই কার্ডেই সম্বোধন: "স্নেহের কুটুম্ব।"
পরিতোষ বাড়ুজ্জে কার্ড দুটো পাশাপাশি রেখে অনেকক্ষণ দেখল। তারপর ক্লাবের বুড়ো ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করল, "কাকা, ধরেন কেউ যদি আপনারে জিগায় আপনে ঘটি না বাঙাল, আর আপনে যদি কোনোটাই না হন — তাইলে কী কন?"
ম্যানেজার বললেন, "এ-শহরে ও-প্রশ্নের 'কোনোটাই না' বলে উত্তর হয় না রে। বলবি 'মাঠের লোক।' ওতে দু'পক্ষই খুশি থাকে, যে যার মতো মানে করে নেয়।"
পরিতোষ হাসল। তার নিজের উত্তরটা সে আপাতত তুলে রাখল — সময়মতো খরচ করবে বলে।
সাত ॥ চন্দননগরের চিঠি
বিয়ের ঠিক তিন দিন আগে নগেন মুখুজ্জের হাতে একটা মোক্ষম অস্ত্র এসে পড়ল। এবং যেমন হয়, অস্ত্রটা এল সবচেয়ে নিরীহ ডাকে — পোস্টকার্ডে।
মুখুজ্জেদের এক দূরসম্পর্কের জ্ঞাতি থাকেন চন্দননগরে; বিয়ের নিমন্ত্রণ পেয়ে তিনি শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখেছেন — "...পাত্রীর ঠাকুর্দা রাখালরাজ ভৌমিকের নামটি দেখিয়া বড় আনন্দ হইল। ইনিই কি আমাদের ত্রিবেণীর রাখাল? আমরা একসঙ্গে ভাগীরথীতে সাঁতার শিখিয়াছি। বাল্যকালে সে গঙ্গার এপারের ছেলে হইয়াও পূর্ববঙ্গের গল্প শুনিতে বড় ভালোবাসিত। তাহার পিতা ত্রিবেণীর ঘাটে পূজারী ছিলেন। রাখাল কেমন আছে? সে কি এখনও চিংড়ি ভালোবাসে? বাল্যে সে একাই আধ-কাঠা চিংড়ি খাইয়া..."
নগেন মুখুজ্জে পোস্টকার্ডটা তিনবার পড়লেন। তারপর দরজা বন্ধ করে আরও দু'বার।
রাখালরাজ ভৌমিক। বিজয়গড় কলোনির বাঙাল-শিরোমণি। ময়মনসিংহের ভিটের গল্পে তিন প্রজন্ম কাঁদানো মানুষ। "যারা চিংড়িরে মাছ কয় তাগো লগে আলোচনা নাই" — সেই তিনি —
ত্রিবেণীর ছেলে? হুগলি জেলা? গঙ্গার এপার? চিংড়ি-খোর??
নগেনবাবুর প্রথম অনুভূতি ছিল বিশুদ্ধ, ঝলমলে আনন্দ। এ-অস্ত্র হাতে থাকলে বেয়াইমশাইয়ের বাঙাল-গর্জন আজীবনের মতো... কিন্তু ভদ্রলোক মানুষ; পরের অনুভূতিটা এল প্রশ্ন হয়ে — ব্যাপারটা কী করে সম্ভব?
উত্তরটা তিনি পুরোপুরি কোনোদিন জানবেন না, তবে পাঠকের জানা দরকার।
রাখালরাজ সত্যিই ত্রিবেণীর ছেলে। বাইশ বছর বয়সে কাজের খোঁজে কলকাতা, সেখানে আলাপ ও প্রণয় ময়মনসিংহ থেকে আসা এক পরিবারের মেয়ে সুপ্রভার সঙ্গে। বিয়ের পর দেশভাগের ডামাডোলে শ্বশুরবাড়ির গোটা পরিবার যখন কপর্দকহীন কলকাতায়, রাখাল তাদের ছেড়ে যাননি — সবাইকে নিয়ে উঠেছিলেন সদ্য-গজানো কলোনির এক চিলতে জমিতে। কলোনির খাতায় নাম লেখানোর দিন কেরানি জিজ্ঞেস করেছিল, "দেশ কোথায়?" পাশে দাঁড়ানো শ্বশুরমশাই উত্তর দেওয়ার আগেই রাখাল বলেছিলেন, "ময়মনসিংহ।" — মিথ্যেটা বলেছিলেন জমির জন্য নয়; বলেছিলেন, কারণ যে-পরিবারটা সব হারিয়ে তাঁর কাঁধে, তাদের "দেশ"-এর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকাটা সেই মুহূর্তে তাঁর কাছে বিশ্বাসঘাতকতা মনে হয়েছিল।
তারপর তিরিশ বছরে মিথ্যেটা আর মিথ্যে থাকেনি — সংসার হয়ে গেছে। সুপ্রভার মুখে শোনা ভিটের গল্পগুলো এত হাজারবার বলেছেন যে গল্পের পুকুরঘাটে এখন তাঁর নিজেরই ছেলেবেলা খেলা করে। স্ত্রী গত হয়েছেন; তাঁর দেশটাকে বাঁচিয়ে রাখা এখন রাখালরাজের কাছে প্রায় শ্রাদ্ধশান্তির মতো পবিত্র কর্তব্য। ইলিশের জয়গান তাঁর কাছে সুপ্রভার গান। পদ্মা সমিতি তাঁর কাছে সুপ্রভার ক্লাব।
মানুষটা নকল বাঙাল নয়। মানুষটা এমন এক ঘটি, যে ভালোবেসে বাঙাল হয়ে গেছে — এবং ধর্মান্তরিতরা যেমন হয়, মূল ধার্মিকদের চেয়ে গোঁড়া।
এ-সবের কতটা নগেন মুখুজ্জে আন্দাজ করেছিলেন বলা কঠিন। তবে তিন দিন পোস্টকার্ডটা পকেটে নিয়ে ঘোরার পর তিনি একটা সিদ্ধান্তে এলেন, যেটা তাঁর জীবনের গভীরতম কূটনৈতিক উপলব্ধি: যে-অস্ত্র ছুড়লে বেয়াই মরে, সে-অস্ত্রে বিয়েও মরে। ছেলের বিয়ের চেয়ে বড় জয় হয় না। পোস্টকার্ড উঠল সিন্দুকে — "প্রয়োজনে" খাতে।
সিন্দুকের জিনিস অবশ্য সিন্দুকে থাকে না। সে-কথায় আসছি।
আট ॥ বারো অগ্রহায়ণ
বিয়ের দিন ভোর থেকেই বোঝা গেল, দিনটা পঞ্জিকার নয়, ফিক্সচারের।
সকালে গায়ে-হলুদের তত্ত্ব এল ভৌমিকবাড়ি থেকে; তত্ত্বের মাছটি সাজানো হয়েছিল লাল-হলুদ রিবনে। মুখুজ্জেবাড়ি থেকে পাল্টা তত্ত্বে গেল সন্দেশ — সবুজ আর মেরুন রঙের, "কাকতালীয়ভাবে।" দুপুরে বাগবাজারের বাড়িতে বরযাত্রীর তালিকা চূড়ান্ত হচ্ছে, দেখা গেল আঠারোজন নাম কাটিয়েছেন — শরীর খারাপ; আঠারোজনেরই, একই দিনে। নগেন মুখুজ্জে তালিকায় চোখ বুলিয়ে হিমশীতল গলায় বললেন, "গ্যালারির টিকিট ক'টায় জোগাড় হল জিজ্ঞেস করো।"
বিকেল চারটেয়, শহরের অন্য প্রান্তে, রেফারির বাঁশি বাজল। আর বিজয়গড়ের বিয়েবাড়িতে — কনের বাড়িতেই বিয়ে — নামল এক অপার্থিব, টানটান নীরবতা। ছাদনাতলা সাজানো হচ্ছে, আলপনা পড়ছে, উলু-শাঁখ প্রস্তুত — কিন্তু গোটা বাড়ির কান একটাই দিকে। প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি পাঞ্জাবির পকেটে, প্রতিটি বারান্দার কার্নিশে — ট্রানজিস্টর। নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল; শুধু কার্যকর ছিল না। এমনকি রান্নার ঠাকুরের উনুনের পাশেও একটা রেডিও চলছিল, এবং লুচি ভাজার তেলের আওয়াজে ধারাবিবরণী ঢাকা পড়ছে বলে ঠাকুর লুচি ভাজা সাময়িক স্থগিত রেখেছিলেন।
খেলার প্রথমার্ধ গোলশূন্য। বিয়েবাড়ির প্রথমার্ধও — বর আসতে দেরি করছে।
দেরির কারণ ঐতিহাসিক। বরের গাড়ি ময়দান-ফেরত ভিড়ে আটকে গিয়েছিল; আশি হাজার লোক একই সময়ে মাঠ থেকে বেরোলে টোপর-পরা ব্যাঙ্ক-অফিসারের জন্যে কেউ রাস্তা ছাড়ে না। গাড়ির ভেতরে বসে অপূর্ব অবশ্য দেরিটা টেরই পাচ্ছিল না — ড্রাইভারের পাশের সিটে রাখা ট্রানজিস্টরে তখন দ্বিতীয়ার্ধ চলছে, এবং টোপরের আড়ালে বরের ঠোঁট নিঃশব্দে নড়ছিল: "পদ্মা... পদ্মা..."
সন্ধে ৬টা ৫২-য় বর এল। শাঁখ বাজল, উলু পড়ল, বরণডালা উঠল — আর ঠিক সেই মুহূর্তে খেলার ঊনসত্তর মিনিটে ভাগীরথী ক্লাব গোল করে বসল।
বরণ করছিলেন কনের জেঠিমা। উলুধ্বনির মাঝখানে বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে এল চাপা, বহুকণ্ঠ হাহাকার — যেন কেউ গণ-দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জেঠিমার হাত কেঁপে বরণডালার প্রদীপ প্রায় নিভে যাচ্ছিল; সামলে নিয়ে তিনি যে-দৃষ্টিতে বরের দিকে তাকালেন, তাতে আশীর্বাদ কম, জাতীয় শোক বেশি।
আর দোতলার জানলায়, বিয়ের বেনারসিতে সাজানো কনে, চন্দনে-আঁকা মুখ — এক পলকের জন্য জানলার পর্দাটা মুঠোয় চেপে ধরল। পাশের ঘরের রেডিও থেকে ভেসে আসছে: "...কী অসাধারণ গোল! ভাগীরথীর সমর্থকরা উন্মাদ!" — কৃষ্ণকলির ঠোঁটের কোণে, চন্দনের নকশার ফাঁকে, ষোলো বছরের চোরা হাসিটা এক সেকেন্ডের জন্য বেরিয়ে পড়ল। ঘরে সাতজন মহিলা ছিলেন; ভাগ্যিস সবাই তখন হাহাকারে ব্যস্ত।
লগ্ন বইয়ে যাচ্ছে। পুরুতমশাই তাড়া দিলেন। ছাদনাতলায় পিঁড়িতে বর, সাতপাকের প্রস্তুতি — আর ময়দানে তখন পঁচাত্তর মিনিটে পদ্মা সমিতি সমতা ফেরাল। ১-১।
এবার হাহাকার আর চাপা রইল না। বিয়েবাড়ির অর্ধেক — কনেপক্ষ — সোল্লাসে ফেটে পড়ল; শাঁখ যিনি বাজাচ্ছিলেন তিনি আনন্দে এমন দীর্ঘ ফুঁ দিলেন যে পুরুতমশাই চমকে মন্ত্র থামিয়ে দিলেন। বরযাত্রীদের দিক থেকে উঠল গোঙানি। রাখালরাজ ভৌমিক, যিনি এতক্ষণ কনের ঠাকুরদার গাম্ভীর্য বজায় রেখে দাঁড়িয়ে ছিলেন, দু'হাত তুলে হুংকার দিলেন, "জয় মা পদ্মা!" — এবং পরক্ষণেই সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় যোগ করলেন, "মানে... বিবাহ শুভ হউক।"
সাতপাক শুরু হল। বর পিঁড়িতে, কনে সাত ভাইয়ের কাঁধে-ধরা পিঁড়িতে ঘুরছে — এক পাক, দুই পাক — আর ধারাবিবরণীকার চেঁচাচ্ছেন: "খেলার আর পাঁচ মিনিট... বল এখন মাঝমাঠে... এই ম্যাচ ড্র হলে লিগ ভাগাভাগি..." — চার পাক, পাঁচ পাক — "...পরিতোষ বাড়ুজ্জে বল ধরলেন! একজনকে কাটালেন! দু'জনকে!..." — ছয় পাক — "বক্সের মাথায় বাড়ুজ্জে! শট নিলেন—"
সপ্তম পাকটি সম্পূর্ণ হওয়া, শুভদৃষ্টির টোপর-মুকুট মুখোমুখি হওয়া, এবং ধারাবিবরণীকারের গলা চেরা "গোওওওওওল!" — এই তিনটি ঘটনা ঘটল একই সেকেন্ডে।
যা ঘটল তাকে ইতিহাসে "বিজয়গড়ের মহাধ্বনি" বলা চলে। কনেপক্ষের দুশো গলা একসঙ্গে ফেটে পড়ল — উলু, শাঁখ, "পদ্মা! পদ্মা!", "বাড়ুজ্জে জিন্দাবাদ!" — কে যে বিয়ের ধ্বনি আর কে গোলের, তা আলাদা করার সাধ্য স্বয়ং প্রজাপতিরও ছিল না। বরযাত্রীরা শোকে পাথর, শুধু আঠারোটি চেয়ার খালি — যাঁরা গ্যালারি থেকে সরাসরি এই মর্মাঘাত নিয়েছেন।
এবং এই মহাধ্বনির ঠিক মাঝখানে, শুভদৃষ্টির সেই আলোকিত মুহূর্তে, পান-পাতা নামিয়ে চার চোখ এক হল — আর ঘটে গেল সেই দুর্ঘটনা, যেটা দুটো মানুষ ষোলো বছর ধরে ঠেকিয়ে রেখেছিল।
বর — যার হৃদয় পদ্মার — গোলের আনন্দ চাপতে পারল না; টোপরের নিচে তার মুখ ভরে উঠল এক নির্লজ্জ, ঝলমলে, লাল-হলুদ হাসিতে।
কনে — যার হৃদয় ভাগীরথীর — হারের ধাক্কা চাপতে পারল না; চন্দন-আঁকা মুখে ফুটে উঠল অবিকল সেই বিষণ্ণতা, যেটা এই মুহূর্তে বরযাত্রীদের মুখে।
দু'জনে দু'জনের মুখ পড়ল। বুঝল। এবং বিয়েবাড়ির চিৎকারে ডোবা সেই শুভদৃষ্টির মধ্যে ঘটল এ-গল্পের প্রকৃত মালাবদল — দুটো চোরাচালান পরস্পরকে চিনে ফেলল।
কনে ঠোঁট নাড়ল, নিঃশব্দে: "তুমি — ওদের?"
বর ঠোঁট নাড়ল: "তুমি — আমাদের?"
তারপর দু'জনেই হেসে ফেলল — এমন হাসি, যেটা বিয়ের ছবিতে "শুভদৃষ্টির মধুর মুহূর্ত" বলে চালিয়ে দেওয়া যায়, অথচ যার আসল মানে: যাক, ঘরের শত্রু ঘরেই রইল।
নয় ॥ মধুরেণ
বাসি-বিয়ের পরদিন প্রীতিভোজ। এবং প্রীতিভোজে ঘটল সেই আগমন, যার জন্যে দুই পরিবারই আলাদা আলাদা করে সপ্তাহভর মহড়া দিয়েছিল।
পরিতোষ বাড়ুজ্জে এলেন। লিগজয়ী গোলের নায়ক, কাগজের প্রথম পাতার মানুষ — বিয়েবাড়িতে ঢুকতেই ভিড় দু'ভাগ, উভয় ভাগেই সমান গুঞ্জন: "আমাদের কুটুম।"
রাখালরাজ এগোলেন প্রথম — "আসো ভাই, আসো! ময়মনসিংহের রক্ত টানে, না?" নগেন মুখুজ্জে পেছনে — "এসো এসো! হাওড়ার সম্পর্কটা তো আরও সোজা, তোমার মামাবাড়ির মেজো..."
পরিতোষ দু'জনকে দু'পাশে নিয়ে খানিকক্ষণ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রইলেন — চিত্রসাংবাদিকরা ছবি তুলল — তারপর শান্ত গলায় বললেন, "দুই দাদুরে একখান কথা কই। কেউ রাগ কইরেন না। আমার ঠাকুর্দার আসল বাড়ি কটকে। উড়িয়া বামুন আমরা — 'বড়ুয়াজে'। কলকাতায় আইসা দাদু খেলার লাইনে নাম লিখাইছিলেন, তখন ক্লাবের খাতায় কেরানিবাবু নিজের মনে কইরা লেইখা দিছিলেন 'বাড়ুজ্জে'। সেই থেইকা আমরা বাঙালি।" তিনি হাসলেন। "তয় আপনেরা দুঃখ পাইয়েন না। ঘটিও না, বাঙালও না — কিন্তু কুটুম তো বটেই। মাঠের লোক সগগলের কুটুম।"
মুহূর্তখানেক স্তব্ধতা। তারপর রাখালরাজ ভৌমিক এমন এক কাণ্ড করলেন যা তাঁর কাছ থেকে কেউ প্রত্যাশা করেনি — হো-হো করে হেসে উঠলেন। হাসতে হাসতে চোখে জল এসে গেল; সে-জলের কতটা হাসির আর কতটা অন্য কিছুর, তা তিনিই জানেন। হাসি থামিয়ে তিনি পরিতোষের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "ভাই রে, তুমি বুঝবা না কী কইলা। এ-শহরে আসল কথাটা জন্ম না — টান। মানুষ যেইখানের ব্যথা বুকে লইয়া ঘোরে, সে সেইখানেরই লোক। কাগজপত্র দিয়া দেশ হয় না।"
কথাটা বলার সময় বুড়োর চোখ একবার — শুধু একবার — গেল নগেন মুখুজ্জের দিকে। আর নগেনবাবু, যাঁর পাঞ্জাবির ভেতর-পকেটে সেই মুহূর্তেও চন্দননগরের পোস্টকার্ডখানা ("প্রয়োজনে" খাতটা তিনি বাড়িতে রাখার ভরসা পাননি), চোখাচোখিটা সয়ে গেলেন এবং অতি ধীরে, প্রায় অদৃশ্যভাবে, মাথাটা একবার হেলালেন।
দুই বৃদ্ধের মাঝখানে যে-চুক্তিটা সম্পাদিত হল, তার কোনো সাক্ষী নেই, দলিল নেই। শুধু ভোজের আসরে দেখা গেল, রাখালরাজ ভৌমিক নিজের হাতে বেয়াইয়ের পাতে মালাইকারির চিংড়ি তুলে দিচ্ছেন — "লন, আপনেগো এই পোকাটা... মন্দ রান্ধে নাই" — এবং খাওয়ার ফাঁকে নিজের পাত থেকেও একটা চিংড়ি তুলে নিলেন, বহু, বহু বছর পরে। প্রথম কামড়ের পর বুড়োর মুখে যে-অভিব্যক্তি খেলে গেল, সেটা ত্রিবেণীর ঘাটে আধ-কাঠা চিংড়ি সাবাড় করা এক বালকের — কিন্তু সে-মুখ পড়ার লোক ভোজবাড়িতে ছিল না। সবাই তখন মাছ নিয়ে ব্যস্ত।
কারণ মেনুতে সেদিন ইলিশ-ভাপা আর চিংড়ির মালাইকারি — পাশাপাশি, এক পাতে। বিয়ের মেনু-বৈঠকে এই যুগ্ম-ব্যবস্থা নিয়ে দু'পক্ষের যে-মহাযুদ্ধ হয়েছিল, শেষে মীমাংসা দিয়েছিলেন হরিসাধন ঘটক — "দুটোই থাকবে। যার যেটা ইচ্ছে খাবেন, যেটা ইচ্ছে ছোঁবেন না। পাত তো ব্যালট নয় যে একটাতেই ছাপ দিতে হবে।"
ঘটকমশাই সেদিন ভোজবাড়ির এক কোণে বসে পরিতৃপ্ত মুখে খাচ্ছিলেন, আর মনে মনে হিসেব মেলাচ্ছিলেন। বিয়ে-বাজারে তাঁর সব ক'টা বাজি লেগেছে — "বিয়া হইবই" থেকে "ছাদনাতলা পার" পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তিনি জিতেছেন, কারণ প্রতিটি ধাপ তিনি নিজের হাতে পার করিয়েছেন। তেত্রিশ বছরে তিনি এই প্রথম নিজের পেশার আসল সংজ্ঞাটা খুঁজে পেলেন, এবং পরে রকের আড্ডায় সেটা প্রকাশও করে ফেলেছিলেন —
"গড়াপেটার গুজবে এত হইচই হল, অথচ আসল কথাটা কেউ ধরল না। ম্যাচ-গড়াপেটা হয়নি ঠিকই, কিন্তু গড়াপেটা একটা হয়েছে বইকি — বিয়েটা। দুই অনিচ্ছুক পক্ষ, ভেতরে ভেতরে ম্যানেজ, ফল আগে থেকে ঠিক — এ ছাড়া ঘটকালি কাকে বলে? তফাত খালি এই, ফুটবলে ওটা করলে জেল হয়, আর বিয়েতে করলে লোকে পায়ের ধুলো নেয়।"
আর নবদম্পতি? ফুলশয্যার রাতে, ফুলে-মোড়া ঘরে, দুই চোরাচালানের প্রথম একান্ত আলাপ হল এইরকম —
কলি বলল, "একটা শর্ত। বাড়িতে যে যা-ই ভাবুক, এ-ঘরের ভেতরে কেউ কারো ক্লাব ছোঁবে না।"
অপূর্ব বলল, "মঞ্জুর। তবে আমারও একটা শর্ত। ছেলেপুলে হলে তাকে কোন ক্লাব করব, সেটা কিন্তু টসে ঠিক হবে না। সে বড় হয়ে নিজে ঠিক করবে।"
কলি খানিক ভাবল। তারপর ঘাড় নাড়ল, "উঁহু। ও-ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। বড় হয়ে যদি ক্রিকেট ধরে?"
এই প্রথম, এবং সম্ভবত শেষবার, ঘটি-বাঙাল প্রশ্নে দুই পক্ষ সম্পূর্ণ একমত হল।
ইলিশ আর চিংড়ি এক জলে চাষ হয় না — সীমান্তটা সত্যি। কিন্তু এক পাতে দিব্যি ধরে, আর এক হেঁশেলে রাঁধলে দুটোরই স্বাদ খোলে — এ-ও সত্যি। বাঙালির ভাগ্য ভালো, তার সবচেয়ে পুরনো যুদ্ধটা এমন এক ময়দানে, যেখানে গোলার বদলে চলে ভাপা আর মালাইকারি।
সে-যুদ্ধ চলুক। রেফারি যেন শুধু ভেটকিটা হাতে রাখেন।
॥ সমাপ্ত ॥
Leave a comment
No account needed. Leave the name blank and you'll get a random one.