All posts
BengaliShort StoryComedy

ভূতের ভোটাধিকার

উনিশশো বাহান্নর প্রথম সাধারণ নির্বাচন — একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক, অথচ সরকারি খাতায় সত্য গল্প (গল্পের সমস্ত চরিত্র, দল ও ভূত কাল্পনিক। মিল খুঁজে পেলে দায় ভোটার তালিকার, লেখকের নয়।)

এক ॥ কুসুমগঞ্জের কেল্লা

কলকাতা থেকে ঘণ্টা তিনেকের রেলপথ, তারপর গরুর গাড়িতে আরও ঘণ্টাখানেক গেলে কুসুমগঞ্জ। আর কুসুমগঞ্জে ঢোকার মুখেই, বটগাছের সারির ওপারে, আকাশ আটকে দাঁড়িয়ে রায়চৌধুরীদের বাড়ি।

বাড়ি না বলে অবশ্য কেল্লা বলাই ভালো। বারোটা দরজা, চোদ্দোটা উঠোন, আর তেরোটা মামলা — এই ছিল বাড়িটার সম্পত্তির হিসেব। এককালে নাকি সদর দেউড়িতে হাতি বাঁধা থাকত। উনিশশো বাহান্ন সালে হাতির জায়গায় বাঁধা থাকত একটা ছাগল, সেটাও বর্গা।

বর্তমান জমিদার শশাঙ্কশেখর রায়চৌধুরী ছিলেন সেই বিরল প্রজাতির মানুষ, যাঁর অতীত যত বড়, বর্তমান তত ছোট, আর ভবিষ্যৎ বলে কোনো বিভাগই খোলা হয়নি। জমিদারি-বিলোপের আইন তখন মাথার ওপর খাঁড়ার মতো ঝুলছে। শশাঙ্কশেখর একে একে বিক্রি করছিলেন ঝাড়লণ্ঠন, বেলজিয়াম আয়না, শ্বেতপাথরের টেবিল — তবে প্রতিটি জিনিস বিক্রির পর তার আংটা বা পায়াটা রেখে দিতেন। বলতেন, "জিনিস যায় যাক, জায়গাটা তো থাকল। বংশের মান জিনিসে নয়, জায়গায়।"

ফলে গোটা বাড়িটা ভরে গিয়েছিল শূন্য আংটা, ফাঁকা কুলুঙ্গি আর অনুপস্থিত আসবাবের দাগে — অতীতের এক আস্ত মিউজিয়াম, যার সব প্রদর্শনী লেখা "এইখানে ছিল।"

বাড়ির কর্মচারী বলতে অবশিষ্ট একজন — নিতাই। বয়স জিজ্ঞেস করলে বলত, "কর্তামশাইদের তিন পুরুষ দেখেছি, চতুর্থটা দেখব কি না ভগবান জানেন।" নিতাই লিখতে-পড়তে জানত না এবং এই নিয়ে তার এক ধরনের প্রশান্ত গর্ব ছিল। বলত, "লেখাপড়া জানি না বলেই তো সবাই এত বিশ্বাস করে। জানলে এতদিনে কী লিখে ফেলতাম, কে জানে।"

আর ছিলেন — কর্তাবাবা।

কর্তাবাবা অর্থাৎ গগনচন্দ্র রায়চৌধুরী, শশাঙ্কশেখরের প্রপিতামহ, দেহ রেখেছিলেন সেই কোন কালে, ইংরেজ আমলের মাঝামাঝি। কিন্তু কুসুমগঞ্জের দৃঢ় বিশ্বাস, কর্তাবাবা বাড়ির পশ্চিমের পোড়ো মহলটা ছাড়েননি। রাতে ওই মহলে আলো জ্বলে। ছায়া নড়ে। কাশির শব্দ হয় — খাঁটি জমিদারি কাশি, যে কাশিতে হুকুম আর হাঁপানি মেশানো থাকে।

পশ্চিমের মহলে তাই কেউ যেত না। খাজনা আদায়ের পেয়াদা পর্যন্ত ও চত্বর এড়িয়ে চলত। কুসুমগঞ্জে প্রবাদই ছিল — রায়চৌধুরীদের দেনা এড়ানো যায়, কর্তাবাবাকে এড়ানো যায় না।

প্রবাদটা যে কতখানি উল্টো সত্যি, তা জানত কেবল একজন। সে-কথা যথাসময়ে।


দুই ॥ গণতন্ত্র আসিতেছে

মাঘ মাসে কুসুমগঞ্জে খবর এল — ভোট হবে।

খবরটা প্রথমে কেউ ঠিক বিশ্বাস করেনি। সরকার নাকি ঘরে ঘরে এসে জিজ্ঞেস করবে, "তুমি কাকে চাও?" — এমন আজগুবি প্রস্তাব কুসুমগঞ্জকে এর আগে কেউ দেয়নি। এতকাল সরকার মানে ছিল এমন এক ব্যাপার, যা চাইবার আগেই পেয়ে বসে থাকতে হত। ভুবন মোড়ল রকে বসে রায় দিলেন, "বুঝলি, ইংরেজ যাবার সময় দেশটা তালা দিয়ে চাবিটা আকাশে ছুঁড়ে গেছে। এখন সবাই মিলে লোফালুফি হচ্ছে। ওরই নাম ভোট।"

তা লোফালুফিরও নিয়মকানুন থাকে। প্রথমে এলেন তালিকা-বাবু — ভোটার তালিকা বানাতে। রোগা, চশমা-পরা, সরকারি মানুষ; সঙ্গে একটা মোটা খাতা আর একটা নিয়ম: প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের নাম চাই।

সমস্যা বাধল নাম নিয়েই।

মেয়েদের নাম জিজ্ঞেস করতেই ঘরে ঘরে শাঁখা-পরা হাত মুখ ঢাকল। শাশুড়িরা এগিয়ে এসে জানালেন, বাড়ির বউয়ের নাম বাইরের লোককে বলতে নেই, অকল্যাণ হয়। তালিকা-বাবু বহু চেষ্টা করলেন, তারপর হাল ছেড়ে লিখতে লাগলেন যা শুনলেন তা-ই — "পটলের মা", "নবীনের বউ", "মেজো গিন্নি"। গণতন্ত্রের প্রথম খাতায় কুসুমগঞ্জের অর্ধেক নাগরিক নথিভুক্ত হলেন সম্পর্ক হিসেবে, মানুষ হিসেবে নয়। তালিকা-বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "উপায় নেই। ফর্মে ঘর আছে, ঘরে নাম নেই।"

পুরুষদের বেলায় উল্টো বিপদ — নাম বেশি। এক-এক জনের ভালো নাম, ডাক নাম, দলিলের নাম, আর ঠাকুরদার দেওয়া নাম মিলিয়ে গড়ে চারটে করে। তালিকা-বাবু শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন, মুখের কথায় ভরসা নেই; পাকা কাগজ দেখে নাম তুলবেন। পাকা কাগজ বলতে কুসুমগঞ্জে দু'টি জিনিস — জমিদারি সেরেস্তার খাজনার খাতা, আর শিবমন্দিরের দাতাদের ফলক।

খাজনার খাতা থেকে নাম উঠল হুড়হুড় করে। আর মন্দিরের শ্বেতপাথরের ফলক থেকে উঠল একটি বিশেষ নাম —

"প্রতিষ্ঠাতা ও সেবায়েত: শ্রীগগনচন্দ্র রায়চৌধুরী।"

তালিকা-বাবু নামটা টুকলেন। ঠিকানা: রায়চৌধুরী ভবন। বয়সের ঘরে একটু আটকালেন — ফলকে জন্মসাল নেই। পাশ থেকে একজন বলল, "উনি তো কর্তাবাবা! উনি এখনও বাড়িতেই আছেন, পশ্চিমের মহলে!" গ্রামসুদ্ধ লোক সমস্বরে সায় দিল। কেউ মিথ্যে বলেনি — কুসুমগঞ্জের বিশ্বাসে কর্তাবাবার উপস্থিতি সূর্যোদয়ের মতোই প্রশ্নাতীত।

তালিকা-বাবু ইতস্তত করে বয়সের ঘরে লিখলেন: "৯০ ঊর্ধ্ব (আনুমানিক)।"

লেখার সময় তাঁর হাত একটুও কাঁপেনি, কারণ সরকারি ফর্মে "মৃত" বলে কোনো ঘর ছিল না। আর সরকারি দর্শনের মূল সূত্রই হল — যার ঘর নেই, তার অস্তিত্ব নেই। ফর্ম যাঁকে মারতে পারে না, তিনি অমর।

এইভাবে, স্বাধীন ভারতের প্রথম ভোটার তালিকায়, মৃত্যুর তিপ্পান্ন বছর পরে, গগনচন্দ্র রায়চৌধুরী নাগরিকত্ব ফিরে পেলেন। সঙ্গে আরও ষোলোজন — খাজনার খাতার সেই পাতাগুলো থেকে, যেগুলো শেষবার হালনাগাদ হয়েছিল যখন দেশে রানি ভিক্টোরিয়া।

মোট সতেরোজন প্রয়াত নাগরিক। সংখ্যাটা মনে রাখবেন। গণতন্ত্র রাখবে।


তিন ॥ লণ্ঠন বনাম উড়োজাহাজ

ভোটের হাওয়া গরম হতেই কুসুমগঞ্জে নেমে এলেন দুই প্রার্থী।

জাতীয় উন্নয়ন দলের প্রার্থী নবগোপাল সরখেল — সদরের ঠিকাদার, যিনি জীবনে যে-ক'টা রাস্তা বানিয়েছেন তার সবগুলোই প্রথম বর্ষায় নিজ দায়িত্বে ধুয়ে দিয়েছেন, যাতে পরের বছর আবার বানানো যায়। তাঁর নির্বাচনী প্রতীক — উড়োজাহাজ। কুসুমগঞ্জের কেউ কোনোদিন উড়োজাহাজ চোখে দেখেনি, ফলে প্রতীকটা কাজ করল ঠিক ভগবানের মতো — যাকে দেখা যায় না, তার ওপরই ভক্তি বেশি।

অন্যদিকে কৃষক-মজুর সংহতির প্রার্থী ভূপেন দাস — প্রাক্তন স্কুলমাস্টার, রোগা, আন্তরিক, এবং এমন দীর্ঘ বক্তৃতা দিতেন যে সভার শুরুতে যারা জোয়ান থাকত, শেষে তারা প্রায় ভোটার। তাঁর প্রতীক — লণ্ঠন।

আর এইখানেই ইতিহাস তার রসিকতাটি সাজিয়ে রেখেছিল।

কারণ কুসুমগঞ্জে লণ্ঠনের ইতিমধ্যেই এক বিশেষ মর্যাদা ছিল। পশ্চিমের মহলে রাতে যে-আলো জ্বলত, সেটা লণ্ঠনের আলো। কর্তাবাবার লণ্ঠন। গাঁয়ের লোক সন্ধেবেলা দূর থেকে সেই জানলার দিকে তাকিয়ে বলত, "কর্তাবাবা জেগে আছেন।" আলো নিভলে বলত, "কর্তাবাবা বিরক্ত হয়েছেন।" আলোটা দু'বার দুললে ফসল ভালো হবে, তিনবার দুললে গাঁয়ে অসুখ আসবে — এই ছিল কুসুমগঞ্জের আবহাওয়া দপ্তর।

অতএব দেয়ালে দেয়ালে যখন লণ্ঠন-ছাপ পোস্টার পড়ল, গাঁয়ে গুঞ্জন উঠল — কর্তাবাবা কি তবে ভূপেন মাস্টারের দিকে?

নবগোপাল সরখেল রাজনীতির লোক; হাওয়ার গন্ধ পেতে তাঁর দেরি হত না। তিনি বুঝলেন, এ কেন্দ্রের আসল ভোটব্যাঙ্ক জ্যান্ত ভোটাররা নয় — ওই পোড়ো মহলের বাসিন্দা। কুসুমগঞ্জ যাকে মানে, তাকে না মানালে উড়োজাহাজ মাটিতেই থাকবে।

কিন্তু ভূতকে মানায় কী করে? সরখেল খোঁজ নিলেন এবং জানলেন — কর্তাবাবার সঙ্গে জীবিত জগতের একটিই যোগসূত্র। নিতাই। একমাত্র নিতাই-ই পশ্চিমের মহলে ঢুকতে পারে; সে-ই সন্ধেয় লণ্ঠনে তেল দিয়ে আসে, ভোগ রেখে আসে।

সেই সন্ধে থেকে নিতাইয়ের জীবনে বসন্ত এল।

প্রথম রাতে সরখেলের লোক এল একজোড়া নতুন ধুতি নিয়ে। পরের রাতে ভূপেন দাসের লোক এল ছাতা নিয়ে। তার পরের রাতে সরখেল স্বয়ং এলেন, হাতে ঝকঝকে টর্চলাইট — "কর্তাবাবাকে দিও। লণ্ঠনের যুগ শেষ, এবার আলোতেও উন্নয়ন।"

নিতাই পরদিন টর্চ ফেরত দিল। গম্ভীর মুখে বলল, "কর্তাবাবা বলেছেন, টর্চে ভূতের অসুবিধে হয়। আলোটা বড় বেয়াদব — যেখানে ফেলা হয় শুধু সেখানেই পড়ে। লণ্ঠনের আলো ঘরের সবাইকে সমান দেয়। কর্তাবাবা ও-জিনিস বদলাবেন না।"

সরখেল ঢোঁক গিলে ভাবলেন, সর্বনাশ — ভূতটা তো নীতিবাগীশ! ভোটের বাজারে এর চেয়ে বিপজ্জনক আর কী আছে?


চার ॥ ছোটবাবু

ভোটের হপ্তাখানেক আগে কুসুমগঞ্জে এলেন প্রিসাইডিং অফিসার — অমলকান্তি রায়। বছর চল্লিশের শান্ত মানুষ, সদর থেকে নিযুক্ত, সঙ্গে সিলমোহর, গালা, আর গোদরেজের দুটো ইস্পাতের বাক্স — প্রতীক-আঁটা ব্যালট বাক্স, এক প্রার্থীর একটা করে। বুথ বসবে রায়চৌধুরী বাড়ির বাইরের বৈঠকখানায় — গোটা অঞ্চলে ওই একটাই পাকা দালান, যার ছাদ এখনও মতামত ছাড়া জল ঢোকায় না।

অমলবাবু বৈঠকখানায় ঢুকে অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। দেয়ালের ফাঁকা আংটাগুলোর দিকে তাকালেন — যেখানে এককালে ঝাড়লণ্ঠন ঝুলত। জানলার পাশের সেই দাগটার দিকে তাকালেন, যেখানে এককালে একটা ইজিচেয়ার ঘষা খেত। তারপর খুব নিচু গলায়, প্রায় নিজেকেই, বললেন, "ছাদের কড়িকাঠে এখনও সেই ঘুড়িটা আটকে আছে কি না কে জানে।"

কথাটা কেউ শুনল না। শোনার কথাও নয়। কারণ কুসুমগঞ্জের কেউ জানত না, চোদ্দো বছর আগে এ-বাড়ি থেকে এক যুবক বেরিয়ে গিয়েছিল — বিধবা-বিবাহ করে, বাপের ত্যাজ্যপুত্র হয়ে, পদবির লেজটুকু কেটে ফেলে। রায়চৌধুরী থেকে শুধু রায় — "লেজ কাটলে পদবিও হালকা হয়, মানুষটাও।" শশাঙ্কশেখরের সেই নির্বাসিত ছোট ছেলে অমলকান্তি আজ ফিরেছে — উত্তরাধিকারী হয়ে নয়, সরকারের প্রতিনিধি হয়ে। যে-বৈঠকখানায় তার ঠাকুরদা প্রজা ঠেঙাতেন, সেখানে সে পাতবে গণতন্ত্রের টেবিল।

পুরনো রাষ্ট্র যাকে বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছিল, নতুন রাষ্ট্র তাকে সেই বাড়ির দখল দিল — তিন দিনের জন্য, ভাড়া ছাড়া, সিলমোহর সমেত।

শশাঙ্কশেখর অফিসারকে অভ্যর্থনা করলেন জমিদারি কেতায়, চিনতে পারলেন না। চোদ্দো বছরে ছেলের মুখে চশমা উঠেছে, গোঁফ উঠেছে, আর সবচেয়ে বড় ছদ্মবেশ — সরকারি গাম্ভীর্য। বাপ শুধু আক্ষেপ করলেন, "সরকার আজকাল বাড়ি বয়ে এসে ভোট নেয়। আমাদের আমলে প্রজার মত জানতে চাওয়াটাকে দুর্বলতা ধরা হত। যাক, আপনারা বসুন। নিতাই! বাবুদের জলখাবার!"

নিতাই জলখাবার আনল। অফিসারের সামনে রেকাবি রাখতে গিয়ে তার হাতটা একবার, শুধু একবার, থমকাল। বুড়ো চোখদুটো অফিসারের বাঁ ভুরুর কাটা দাগটার ওপর স্থির হল — সেই দাগ, যেটা হয়েছিল পাঁচিল থেকে পড়ে, আম পাড়তে গিয়ে, তেত্রিশ বছর আগে; সে-ই তো কাঁধে করে ডাক্তারের কাছে ছুটেছিল।

নিতাই কিছু বলল না। রেকাবি নামিয়ে সরে গেল।

লিখতে-পড়তে না-জানা মানুষদের এই এক সুবিধে — তারা জানে, সব চেনা প্রকাশ করতে নেই। কোনটা কোথায় জমা রাখতে হয়, নিতাইয়ের চেয়ে ভালো এ-তল্লাটে কেউ জানত না।


পাঁচ ॥ পশ্চিমের মহল

ভোটের আগের রাতে অমলকান্তি ঘুমোতে পারলেন না।

নিয়ম ছিল, প্রিসাইডিং অফিসার ব্যালট বাক্স আগলে বুথেই রাত কাটাবেন। কিন্তু নিজের জন্মভিটেয় পাহারাদার হয়ে শুয়ে ঘুম আসে না। মাঝরাতে তিনি লণ্ঠন হাতে উঠলেন। পায়ে পায়ে চলে গেলেন সেই দিকটায়, যেদিকে যেতে ছেলেবেলায় তাঁরও বুক ঢিপঢিপ করত — পশ্চিমের মহল।

ভাঙা দালান, বটের ঝুরি, খসে পড়া কার্নিশ। আর তার মধ্যে, দোতলার একটা ঘরে — আলো।

অমলকান্তি সিঁড়ি ভেঙে উঠলেন। দরজা ঠেলতেই দেখলেন, মাটিতে আসন পেতে এক শীর্ণ বুড়ো মানুষ পরম নিশ্চিন্তে ভোগের খিচুড়ি খাচ্ছে, পাশে জ্বলছে কর্তাবাবার কিংবদন্তি লণ্ঠন।

মানুষটা অফিসারকে দেখে পালানোর চেষ্টাও করল না। শুধু ক্লান্ত গলায় বলল, "ধরা যখন পড়লাম, বসুন। খিচুড়ি খাবেন? কর্তাবাবার ভোগ, তবে রাঁধে নিতাইয়ের বোন — হাতটা ভালো।"

পরের এক ঘণ্টায় অমলকান্তি যে-কাহিনি শুনলেন, কোনো সরকারি ফর্মে তার ঘর নেই।

মানুষটার নাম হারান মণ্ডল। রায়চৌধুরীদের প্রজা ছিল, তিন পুরুষের। ন'বছর আগে, সেই আকাল আর তার পিছু পিছু আসা খাজনার তাগাদার বছরে, হারানের যা যাবার সব গেল — রইল শুধু দেনা, আর দেনার সুদ, আর সুদের পেয়াদা। পালাবে কোথায়? পেয়াদারা সব রাস্তা চেনে। একটাই জায়গা ছিল জেলায়, যেখানে খাজনার লোক পা দেয় না।

জমিদারের নিজের বাড়ি। পশ্চিমের মহল। কর্তাবাবার মহল।

"বুঝলেন বাবু," হারান খিচুড়ি মাখতে মাখতে বলল, "বাঘের হাত থেকে বাঁচতে হলে বাঘের গুহাই সবচেয়ে নিরাপদ, কারণ ওখানে বাঘ শিকার করে না, ঘুমোয়। আমি সেই ঘুমের মধ্যে ন'টা বছর কাটিয়ে দিলাম।"

প্রথম প্রথম সে শুধু লুকিয়ে থাকত। কাশিটা তার আজন্ম — সেই কাশি শুনেই গাঁয়ে রটল কর্তাবাবা ফিরেছেন। তারপর একদিন নিতাই ধরে ফেলল। ধরে ফেলে যা করল, তা হারান আজও ভাবলে অবাক হয় — বুড়ো কিছুই বলল না, শুধু পরদিন থেকে ভোগের পরিমাণ বাড়িয়ে দিল।

"সেই থেকে ব্যবস্থাটা চলছে। গাঁয়ের লোক কর্তাবাবার নামে ভোগ দেয়, ভোগ খাই আমি। মাঝে মাঝে লণ্ঠনটা দোলাই — না দোলালে লোকের মন খারাপ হয়। সত্যি বলতে কী বাবু, ভূত হওয়ার পর আমার খাওয়াদাওয়ার যা উন্নতি হয়েছে, জ্যান্ত অবস্থায় আমি কোনোদিন অতটা জ্যান্ত ছিলাম না।"

অমলকান্তি জিজ্ঞেস করলেন, "আর বেরোননি কেন এত বছরে? এখন তো..."

"বেরিয়ে যাব কোথায়?" হারান হাসল। "বাইরে আমার নামে দেনার দলিল আছে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। বাইরে হারান মণ্ডল একটা ফেরারি আসামি। আর এই মহলে? এখানে আমি কর্তাবাবা। লোকে ভয় করে, ভক্তি করে, খেতে দেয়। বলুন তো বাবু, কোন পাগল সম্মানের ভূত ছেড়ে অপমানের মানুষ হতে যায়?"

অমলকান্তি চুপ করে বসে রইলেন। কথাটা তাঁর নিজের জীবনের গায়েও কোথায় যেন লাগল — তিনিও তো পদবি ছেড়ে বেঁচেছেন। এ-বাড়ি মানুষকে দুটো পথ দেয়: হয় নাম মুছে পালাও, নয় মরে গিয়ে থেকে যাও।

উঠবার আগে তিনি একটাই কথা বললেন, "কাল ভোট। বৈঠকখানায় বুথ। সাবধানে থাকবেন।"

হারান লণ্ঠনের পলতেটা নামাতে নামাতে বলল, "জানি। তালিকায় নাকি কর্তাবাবার নামও উঠেছে।" তার চোখে হঠাৎ একটা আলো খেলে গেল, যেটা লণ্ঠনের নয়। "বাবু, একটা কথা বলবেন? মরা মানুষের নাম তালিকায় উঠলে, ভোটটা কি পাপ হবে?"

"আইনত," অমলকান্তি দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, "তালিকায় যার নাম আছে, ভোট তার অধিকার। আর সরকারি খাতা কখনো মিথ্যে বলে না — এই বিশ্বাসের ওপরেই তো গোটা সরকারটা দাঁড়িয়ে।"

কথাটা বলে তিনি নেমে গেলেন। পিছনে, অন্ধকার মহলে, একটা লণ্ঠন অনেকক্ষণ ধরে দুলতে লাগল — দু'বার নয়, তিনবার নয়; হিসেবহীন, খুশির দুলুনি।


ছয় ॥ ভূতের ইস্তেহার

এইবার সেই অধ্যায়, যেটা কুসুমগঞ্জের ইতিহাসে কোথাও লেখা নেই, অথচ যার ফল আজও খালের জলে বয়ে যাচ্ছে।

ভোটের আগের সপ্তাহে দুই প্রার্থীই শেষ চাল দিয়েছিলেন। দু'জনেই আলাদা আলাদা রাতে নিতাইকে ধরেছিলেন — কর্তাবাবার আশীর্বাদ চাই। খোলাখুলি। দরদস্তুর সমেত।

নিতাই দু'জনকেই একই উত্তর দিয়েছিল, "কর্তাবাবাকে জিজ্ঞেস করে বলব।"

এবং জিজ্ঞেস সে সত্যিই করত। পশ্চিমের মহলে, ভোগের থালার পাশে বসে, দুই বুড়োয় শলা হত। হারান শুনত, ভাবত, তারপর রায় দিত। পরদিন নিতাই সেই রায় নামিয়ে আনত মর্ত্যে — "কর্তাবাবা বলেছেন।"

আর কর্তাবাবার দাবিগুলো ছিল শোনবার মতো।

সরখেলকে বলা হল — কর্তাবাবা চান, খাজনার পুরনো সুদ যেন কারো ঘাড়ে না চাপে; নইলে অভিশাপ। সরখেল ঠিকাদার মানুষ, অভিশাপের চেয়ে হিসেব ভালো বোঝেন; কিন্তু ভোটের বাজারে অভিশাপও একটা হিসেব। তিনি জনসভায় ঘোষণা করলেন, জিতলে পুরনো সুদ মকুবের জন্য লড়বেন।

ভূপেন দাসকে বলা হল — কর্তাবাবা চান, উত্তরের মাঠে খাল; আর ইস্কুলের চালটা যেন এ-বর্ষার আগেই সারানো হয়। মাস্টারমশাই অবাক — ভূতের সঙ্গে তাঁর দলের কর্মসূচি মিলে যাচ্ছে হুবহু! তিনি ভাবলেন, জনগণের দাবি এতই বস্তুনিষ্ঠ যে মৃত্যুর পরেও তা মানুষের মনে থেকে যায়। আসল ব্যাপারটা অবশ্য সোজা ছিল — ভূতটা নিজে চাষি।

কুসুমগঞ্জ ধন্য ধন্য করল। এমন ভূত ক'টা গাঁয়ের ভাগ্যে জোটে — যে শেকল নাড়ে না, নাড়ে দাবিদাওয়া? আসলে সতেরো বছরের জমিদারি আর ন'বছরের ভূতগিরি মিলিয়ে হারান মণ্ডল দুটো পেশারই ভেতরটা দেখে ফেলেছিল, আর বুঝেছিল একটা মোক্ষম কথা: জ্যান্ত চাষির দাবি কেউ শোনে না, কিন্তু মরা জমিদারের ইচ্ছে অমান্য করার সাহস কারো নেই। অতএব চাষির দাবিগুলো সে জমিদারের গলায় পেশ করত। গণতন্ত্র আসার আগেই কুসুমগঞ্জে জনমত প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল — শুধু জনমতটা পরলোক ঘুরে আসত, এই যা।

কেবল একটা দাবিতে দুই প্রার্থীই থমকে গিয়েছিলেন। কর্তাবাবার শেষ শর্ত ছিল: "ভোটের দিন কেউ যেন মিথ্যে না বলে।"

সরখেল শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন, "বাকি সব পারব। এটা... এটা কি একটু শিথিল করা যায় না? আমার পেশাটাও তো দেখতে হবে।"

ভূপেন দাস শুনে বলেছিলেন, "মহৎ দাবি। তবে 'মিথ্যে'-র সংজ্ঞাটা নিয়ে একটা আলোচনাসভা হওয়া দরকার।"

দুই দল, দুই মত, দুই প্রতীক — কিন্তু সত্যের প্রশ্নে এমন মধুর ঐকমত্য কুসুমগঞ্জ আর দেখেনি।


সাত ॥ ভোটের দিন

ফাল্গুনের সেই সকালটা কুসুমগঞ্জ কোনোদিন ভুলবে না।

ভোর থেকে বৈঠকখানার সামনে লাইন — গণতন্ত্রের প্রথম লাইন, এবং সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র লাইন যেখানে লোকে সেজেগুজে এসেছিল। কেউ বিয়ের জামা পরে, কেউ কপালে চন্দন কেটে। ভুবন মোড়ল এসেছিলেন পাগড়ি বেঁধে; বললেন, "সরকার আজ প্রথম আমার মত জানতে চেয়েছে। বেয়াইবাড়ির চেয়ে কম যায় কীসে?"

ভেতরে টেবিলে অমলকান্তি, দু'পাশে দুই দলের এজেন্ট, সামনে দুটো ইস্পাতের বাক্স — একটায় উড়োজাহাজ, একটায় লণ্ঠন। ভোটার ঢুকবে, নাম মিলবে, আঙুলে কালি পড়বে, হাতে পাবে ব্যালট — তারপর পর্দার আড়ালে গিয়ে পছন্দের প্রতীকের বাক্সে কাগজ ফেলবে। সরল ব্যবস্থা। অন্তত কাগজে।

প্রথম গোল বাধল কালিতে। আঙুলে কালি দেখে হরমোহনের বউ বেঁকে বসলেন — "এ আবার কীসের এঁটো? বিয়ের সময়ও তো এমনধারা কিছু হয়নি!" এক প্রৌঢ় ভোট দিয়ে বেরিয়ে ফিরে এলেন, "বাবু, কালিটা এবার তুলে দিন। গিন্নি দেখলে জিজ্ঞেস করবে কোথায় গিয়েছিলাম, আর সত্যি বললে বিশ্বাস করবে না।" তালিকার "পটলের মা"-রা এলেন দল বেঁধে, ঘোমটার ভেতর থেকে; পরিচয় যাচাইয়ের প্রশ্নে এজেন্টরা হিমশিম — ঘোমটার ভেতরে কে পটলের মা আর কে নবীনের বউ, তা একমাত্র পটল আর নবীনই জানে, এবং তারা ভেতরে অনুপস্থিত।

লণ্ঠন-বাক্স নিয়েও বিভ্রাট হল। এক বৃদ্ধা ঢুকেই দুই বাক্সকে প্রণাম করে জিজ্ঞেস করলেন, "কোনটা কর্তাবাবার?" এজেন্টরা লাফিয়ে উঠল — একজন বলল লণ্ঠনই কর্তাবাবার আলো, অন্যজন বলল কর্তাবাবা আধুনিক মনের মানুষ, উড়োজাহাজে চড়েই তো স্বর্গে গেছেন। অমলকান্তি টেবিল চাপড়ে দু'জনকেই বার করে দিলেন। বৃদ্ধা পর্দার আড়ালে গিয়ে যা করার করলেন; বেরিয়ে এসে প্রসন্ন মুখে বললেন, "দুটোতেই মাথা ঠেকিয়ে এসেছি, একটাতে কাগজ। ঠাকুর-দেবতার ব্যাপারে ঝুঁকি নিতে নেই।"

বেলা গড়াল। লাইন ছোট হল। সূর্য পশ্চিমের মহলের ভাঙা ছাদের পেছনে নামছে, এমন সময় —

বুথের দরজায় এসে দাঁড়াল এক দীর্ঘ, শীর্ণ মূর্তি। গায়ে জড়ানো একখানা প্রাচীন শাল — সে-শালের জমিতে এখনও জমিদারি আমলের কারুকাজ, আর ন'বছরের ধুলো। মাথা ঢাকা। মুখ ছায়ায়।

বৈঠকখানা নিস্তব্ধ। ভুবন মোড়লের পাগড়ি সমেত মাথাটা আপনা থেকেই নিচু হয়ে গেল।

মূর্তি টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। অমলকান্তি চোখ তুললেন। শালের ফাঁকে যে-মুখ, তা তিনি চব্বিশ ঘণ্টা আগেই খিচুড়ি খেতে দেখেছেন। তাঁর কলম একবার থামল।

"নাম?"

ছায়ার ভেতর থেকে উত্তর এল — গম্ভীর, ধীর, প্রতিটি অক্ষরে সেরেস্তার ধুলো:

"শ্রীগগনচন্দ্র রায়চৌধুরী।"

দুই এজেন্ট সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েছিল — "আপত্তি!" কিন্তু শব্দটা দু'জনেরই গলায় আটকে গেল। তারা পরস্পরের দিকে তাকাল। দু'জনের মাথাতেই তখন একই অঙ্ক ঘুরছে: এ-ভোট আটকালে কর্তাবাবা চটবেন। কর্তাবাবা চটলে গাঁ চটবে। আর যদি না আটকাই, ভোটটা তো আমার দিকেও পড়তে পারে... নিজের পক্ষে পড়া অন্যায় ভোটকে অন্যায় বলার মতো নীতিজ্ঞান রাজনীতিতে আজও জন্মায়নি, তখন তো নয়ই।

দুই এজেন্ট প্রায় সমস্বরে বলল, "আপত্তি... নেই। কোনো আপত্তি নেই। আসুন, কর্তাবাবা, আসুন।"

অমলকান্তি তালিকা দেখলেন। নাম আছে — ক্রমিক ৩৪১, গগনচন্দ্র রায়চৌধুরী, ৯০ ঊর্ধ্ব (আনুমানিক), ঠিকানা রায়চৌধুরী ভবন। সব মিলছে। সরকারি খাতার সঙ্গে বাস্তবের এমন নিখুঁত মিল সরকারি খাতা নিজেও কমই দেখেছে।

তিনি শান্ত গলায় বললেন, "তালিকায় নাম আছে। খাতা মিথ্যে বলে না।" — এবং কালির শিশিটা এগিয়ে দিলেন।

শালের ভেতর থেকে যে-হাতটা বেরোল, তার আঙুলে কালি পড়ল, কাগজ উঠল। শুধু অমলকান্তি খেয়াল করলেন, ভূতের হাতটা রোদে-পোড়া, লাঙল-ধরা, আর কালি লাগানোর সময় একটু কাঁপছে — এত সম্মানের ভার সে-হাত জীবনে এই প্রথম বইছে।

মূর্তি পর্দার আড়ালে গেল। কোন বাক্সে কাগজ পড়ল, তা পর্দাই জানে। বেরিয়ে আসার সময় সে এক মুহূর্তের জন্য থামল অমলকান্তির টেবিলের সামনে। শালের ছায়ার ভেতর থেকে খুব মৃদু, প্রায় অশ্রুত গলায় ভেসে এল, "বেঁচে থাকুন, বাবু।"

আশীর্বাদটা কে কাকে দিল — মৃত জমিদার সরকারি অফিসারকে, না ফেরারি প্রজা ত্যাজ্য জমিদারপুত্রকে — এ-প্রশ্নের মীমাংসা আজও হয়নি।

মূর্তি বেরিয়ে গেল। আর দরজার পাশে দাঁড়ানো নিতাই — যে এতক্ষণ ঠায় সব দেখছিল — এগিয়ে এসে অমলকান্তির টেবিলে জলের গেলাসটা ভরে দিল। দিতে দিতে, কারো দিকে না তাকিয়ে, বুড়ো খুব আস্তে বলল, "ছোটবাবু, আমগাছটা এখনও আছে। এবার মুকুল ভালো হয়েছে।"

অমলকান্তির কলমটা খাতার ওপর স্থির হয়ে রইল অনেকক্ষণ।

সেই সন্ধ্যায় কুসুমগঞ্জের বুথে উপস্থিত প্রতিটি মানুষ ছিল অন্য কেউ — ফেরারি প্রজা ছিল মৃত জমিদার, ত্যাজ্যপুত্র ছিল নিরপেক্ষ অফিসার, ঘোমটার আড়ালের ভোটাররা ছিলেন কারো-না-কারো মা। খাঁটি পরিচয়ে হাজির ছিলেন কেবল একজন — গগনচন্দ্র রায়চৌধুরী। যিনি নেই।

গণতন্ত্র সেদিন সবাইকে ধারণ করেছিল। প্রশ্ন শুধু একটাই করেছিল — তালিকায় নাম আছে তো?


আট ॥ গণনা

গণনা হল মহকুমা শহরে, দিন তিনেক পরে।

বেলা তিনটে নাগাদ ফল দাঁড়াল — কৃষক-মজুর সংহতির ভূপেন দাস জয়ী। ব্যবধান: সতেরো ভোট।

সংখ্যাটা শোনামাত্র গণনাকক্ষের দুই প্রান্তে দুটো হিসেব প্রায় একই সঙ্গে মিলে গেল। দুই দলের জেলা-স্তরের কর্তারাই ভোটার তালিকা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছিলেন, এবং দু'পক্ষই নিজের মতো করে আবিষ্কার করেছিল সেই সতেরোটি নাম — খাজনার খাতা আর মন্দিরের ফলক থেকে উঠে আসা সতেরোজন প্রয়াত নাগরিক, যাঁদের প্রত্যেকের নামে ভোট পড়েছে।

সরখেল-শিবিরে তুমুল উত্তেজনা। পুনর্গণনা চাই! তদন্ত চাই! মরা মানুষের ভোটে জেতা চলবে না!

দরখাস্ত প্রায় লেখা হয়ে গিয়েছিল, এমন সময় দলের এক প্রবীণ হিসেবি নেতা সরখেলকে আড়ালে ডেকে নিলেন। "দরখাস্তের আগে একটা কথা। তদন্ত হলে শুধু ওদের মরা ভোট ধরা পড়বে না, আমাদেরগুলোও পড়বে। পাশের দুটো কেন্দ্রে আমরা যে-ব্যবধানে জিতেছি, সেখানকার তালিকাতেও... মানে, বুঝতেই পারছেন। মরা মানুষ কোনো দলের সম্পত্তি নয়, ওঁরা সর্বত্র সমান সক্রিয়। খোঁচাখুঁচি করলে দু'পক্ষের কবরই খুলবে।"

সরখেল ঠিকাদার মানুষ; কোন গর্ত খুঁড়তে নেই, এ-জ্ঞান তাঁর পেশাগত। দরখাস্ত ছেঁড়া হল। পরদিন তিনি বিবৃতি দিলেন — "গণতন্ত্রের রায় শিরোধার্য। পরাজয়ে আমি দুঃখিত নই, কারণ কুসুমগঞ্জের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ নিশ্চয়ই কোনো মহৎ উদ্দেশ্যেই ও-দিকে গেছে।"

জয়ী ভূপেন দাস পাল্টা বিবৃতিতে বললেন, "জীবিত ও মৃত — সর্বস্তরের মানুষ আমাদের কর্মসূচি সমর্থন করেছেন, এটাই প্রমাণ যে আমাদের আদর্শ কালোত্তীর্ণ।"

এই প্রথম, এবং সম্ভবত শেষবার, বাংলার দুই যুযুধান দল একটি বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত হল — মৃতদের অসম্মান করা অনুচিত। বিশেষত যখন তাঁরা এত নিয়মিত ভোট দেন।

কিন্তু আসল ঘটনাটা ঘটে গিয়েছিল তার আগেই, গণনার টেবিলে — যেটা কাগজে ওঠেনি।

কুসুমগঞ্জ বুথের লণ্ঠন-মার্কা বাক্স খুলে গণনাকারীরা কাগজ মিলিয়ে দেখলেন — খাতার হিসেবের চেয়ে কাগজ একখানা বেশি। এবং সেই বাড়তি কাগজখানা সরকারি ব্যালটই নয়। হলদে হয়ে যাওয়া, ভাঁজে ভাঁজে প্রায় ছিঁড়ে আসা একটা পুরনো পাতা — কোনো সাবেক খাতা থেকে ছেঁড়া। তাতে জলে-ধোয়া, তবু পাঠযোগ্য, টানা-টানা প্রাচীন হস্তাক্ষরে লেখা:

"প্রজাদিগের দুর্দশা স্বচক্ষে দেখিলাম। আগামী তিন সন খাজনা মকুব করা গেল। বিরুদ্ধমত গ্রাহ্য হইবে না। ইতি — শ্রীগগনচন্দ্র রায়চৌধুরী। ১২৯৯ সাল।"

গণনাকারীরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। ১২৯৯ বঙ্গাব্দ মানে ইংরেজির হিসেবে ষাট বছর আগের কাগজ। ভোট হিসেবে অচল, সন্দেহ নেই — প্রতীকের ছাপ নেই, নির্ধারিত ব্যালটও নয়। রিটার্নিং অফিসার ঘোষণা করলেন, "বাতিল।"

কিন্তু কাগজটা ফেলার আগে কুসুমগঞ্জ বুথের প্রিসাইডিং অফিসার অমলকান্তি রায় হাত বাড়ালেন। "ওটা আমি রাখছি। নথির স্বার্থে।"

কেউ আপত্তি করল না। বাতিল জিনিসে সরকারের মায়া থাকে না।

অমলকান্তি কাগজটা ভাঁজ করে বুকপকেটে রাখলেন। পরে জানা গিয়েছিল — না, সে-মকুবের হুকুম কোনোদিন কার্যকর হয়নি; সেরেস্তার আমলারা আর পরিবারের বাকিরা মিলে বুড়ো কর্তার "ভাবের বাড়াবাড়ি" বলে হুকুমখানা খাতা থেকে ছিঁড়ে পোড়ো মহলের সিন্দুকে চালান করে দিয়েছিল, আর তিন সনের খাজনা সুদসমেত আদায় হয়েছিল। ষাট বছর পরে সিন্দুক খুলেছিল এক ফেরারি প্রজা, এবং ঠিক করেছিল — এ-বাড়ির তরফ থেকে প্রজাদের পক্ষে যে-একখানা মাত্র ভোট কোনোদিন পড়েছিল, গণতন্ত্রের প্রথম দিনে সেটা বাক্সে পৌঁছে দেওয়া তার কর্তব্য। ছাপ্পা নয় — ষাট বছর লেটে পৌঁছনো একটা ডাক।

রায়চৌধুরীদের দলিল-দস্তাবেজ ছিল তেরো মামলার, চোদ্দো সিন্দুকের। কিন্তু উত্তরাধিকার বলতে ওই একটাই কাগজ ছিল। এবং নিয়তির পাকা হাতের বিচারে সেটা পেল সেই ছেলে, যাকে পরিবার উত্তরাধিকার থেকেই বাদ দিয়েছিল।


নয় ॥ খাসমহল

বছর ঘুরতে না ঘুরতে জমিদারি-বিলোপ আইন কুসুমগঞ্জে পৌঁছল। রায়চৌধুরী এস্টেট গেল সরকারের খাস দখলে। শশাঙ্কশেখর ভেস্ট-হওয়া সম্পত্তির ক্ষতিপূরণের ফর্ম ভরতে বসে আবিষ্কার করলেন, ফর্মে "বংশমর্যাদা" বলে কোনো ঘর নেই; অতঃপর তিনি অবশিষ্ট জীবনটা কাটালেন ওই ঘরটা কেন নেই, তা নিয়ে দরখাস্ত লিখে।

আর পুরনো দেনা, বকেয়া খাজনা, তামাদি পরোয়ানা — সব গেল আইনের ভাষায় "অবলুপ্ত" হয়ে। যার অর্থ, ন'বছর পরে, হারান মণ্ডল আবার আইনত জ্যান্ত হওয়ার ছাড়পত্র পেল।

মুশকিল হল, কুসুমগঞ্জ রাজি হল না।

গাঁয়ের লোক হিসেব কষে দেখল — কর্তাবাবা থাকাকালীন সুদ মকুব হয়েছে, খাল মঞ্জুর হয়েছে, ইস্কুলের চাল সারানো হয়েছে। এমন ফলদায়ী প্রতিষ্ঠান গাঁ-ছাড়া করার মতো নির্বোধ কুসুমগঞ্জে জন্মায়নি। অতএব হারান বেরোল বটে, কিন্তু মানুষ হিসেবে নয় — "কর্তাবাবার সেবক" হিসেবে, যে-পদের কোনো নিয়োগপত্র নেই, অথচ ভোগ বরাদ্দ আছে।

আর সবচেয়ে বড় মোচড়টা দিল স্বয়ং সরকার।

রায়চৌধুরী ভবনের বাইরের মহলে বসল ব্লক অফিস। সরকারি সম্পত্তি — অতএব রাত-পাহারাদার চাই। দরখাস্ত পড়ল একটাই। ব্লকের বড়বাবু ইন্টারভিউয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "রাতে ও-বাড়িতে একা থাকতে পারবে? লোকে বলে ভূত আছে।"

হারান বিনীত গলায় বলেছিল, "আজ্ঞে, ভূতের সঙ্গে আমার বহুদিনের জানাশোনা। অসুবিধে হবে না।"

মাসিক বেতন বাইশ টাকা ধার্য হল। এইভাবে, স্বাধীন ভারতের সরকার, জমিদারি ভেঙে যা-যা খাস করেছিল তার তালিকায় নিঃশব্দে যোগ হল আরও একটি সম্পত্তি — কুসুমগঞ্জের ভূত। জাতীয়করণ সম্পূর্ণ হল: লণ্ঠনের তেল এখন থেকে সরকারি বাজেটে।

আর নিতাই? সে রয়ে গেল যেখানে ছিল — দুই জগতের মাঝখানে, রেকাবি হাতে। শুধু এখন সন্ধেবেলা ব্লক অফিসের বারান্দায় বসে সে মাঝে মাঝে উত্তরের মাঠের দিকে তাকায়, যেখানে নতুন খাল কাটা হচ্ছে, আর আপনমনে বলে, "কর্তামশাই জ্যান্ত থাকতে এত কাজ করেননি।"


উপসংহার ॥ জ্যেষ্ঠ ভোটার

পাঁচ বছর পরে, উনিশশো সাতান্নর নির্বাচনের আগে, ভোটার তালিকা সংশোধনে এলেন নতুন এক তালিকা-বাবু। উৎসাহী, তরুণ, নিয়মে নিষ্ঠাবান। কুসুমগঞ্জের তালিকায় ক্রমিক ৩৪১ দেখে তাঁর ভুরু কুঁচকে গেল।

"গগনচন্দ্র রায়চৌধুরী। ইনি তো... মানে, শুনছি ইনি জীবিত নন। নাম কাটতে হবে। মৃত্যুর প্রমাণপত্র কই?"

ব্লক অফিসে খোঁজ পড়ল। এবং দেখা গেল, প্রমাণপত্র অসম্ভব। ভদ্রলোক দেহ রেখেছেন এমন এক আমলে, যখন মৃত্যুর জন্য সরকারি সার্টিফিকেট লাগত না — মৃত্যু তখনো ব্যক্তিগত ব্যাপার ছিল, দপ্তরের নয়। ডেথ সার্টিফিকেট নেই, অতএব দাখিল করা যাবে না; দাখিল না হলে নাম কাটা যাবে না; নাম না কাটলে তিনি ভোটার।

তরুণ তালিকা-বাবু ফাইলে লিখলেন: "সংশ্লিষ্ট ভোটারের মৃত্যু প্রমাণিত না হওয়ায় নাম বহাল রহিল।" — এবং সেই মুহূর্তে সরকারি ভাষা তার নিজস্ব নিয়মে একটি দার্শনিক সত্য উৎপাদন করল: যাঁর মৃত্যু প্রমাণিত নয়, তিনি জীবিত। কাগজ যাঁকে মারতে পারেনি, দাহও তাঁকে ছুঁতে পারে না।

কুসুমগঞ্জ খবরটা পেয়ে ধন্য ধন্য করল। এবং সাতান্নর ভোটে এক নতুন প্রথা চালু হল, যা নাকি আজও ও-তল্লাটে বহাল — প্রচারে নেমে প্রত্যেক প্রার্থী প্রথমে যান পশ্চিমের মহলের নিচে, ফলকের সামনে, কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠতম ভোটারকে মালা দিতে। জ্যান্ত ভোটারদের কাছে যাওয়ার আগে মৃত ভোটারের আশীর্বাদ — কুসুমগঞ্জে এটাই শুভ প্রথা।

জমিদারি গেল, কাছারি গেল, হাতিশাল-ঘোড়াশাল সব গেল। রইলেন শুধু গগনচন্দ্র রায়চৌধুরী — সরকারি তালিকায়, ক্রমিক ৩৪১-এ, "৯০ ঊর্ধ্ব (আনুমানিক)" বয়সে চিরস্থির।

এ-দেশে অমরত্বের আসলে ওই একটাই রাস্তা। স্মৃতিতে নয়, স্থাপত্যে নয়, এমনকি সন্তানসন্ততিতেও নয় —

সরকারি খাতায় নাম তুলে ফেলা। তারপর নিশ্চিন্তে মরে যাওয়া।

খাতা মিথ্যে বলে না। খাতা কাউকে ছাড়েও না।

॥ সমাপ্ত ॥

Leave a comment

No account needed. Leave the name blank and you'll get a random one.

0/2000